অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবী দাওয়া। জীবনের মানে কি শুধু জন্মের দিন মনে রাখা?

আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, প্রতি বছর আগষ্ট মাসের ২৪ তারিখ এলেই আপনাদের হঠাৎ মনে পড়ে আরে, উল্লাস দাদা উল্লাস! ১৬৯০ এ চার্নক সাহেব একে গঙ্গা-হুগলী ছেঁচে বের করেছিলেন, আজকেই চল এর জন্মদিন পালন করি। ধূর মশাই আমার জন্মদিন আজকে না!

সাহেব বাবু আমাকে গঙ্গা-হুগলী ছেঁচে তুলে আনেনি। আমি অনেক আগে থেকেই এখানে আছি।
হ্যা একদম ঠিক শুনেছেন, নিমাই যখন কিতকিত খেলছে আমি তখন ইতোমধ্যে বিপ্রদসের হাত ধরে  চাঁদ সওদাগরের সাথে ঢুকে পরেছি "মনসাবিজয়" কাব্যে। এরপরে মুকুন্দরাম এর মাধ্যমে আবার উঁকিঝুঁকি দিলাম ধনপতির সিংহল যাত্রায়: চন্ডীকাব্যে। আলাওলের পদ্মাবতী: দাদা, এটা ঘুমর ঘুমর এর বাংলা ভার্সন - জায়সি র অনুপ্রেরণায় আরাকান সভায় আলাওল বাংলায় নিয়ে আসেন পদ্মাবতী কে। সেই খানেও ঢুকে গেলাম আমি। এরপর কৃষ্ণরামদাসের "কালিকামঙ্গলে" ও আমাকে দেখতে পাবেন। সব কিন্তু ১৬৯০ সালের আগেই রচিত হয়েছিল স্যর।
জানি উচ্চমাধ্যমিকে "বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস" ফাঁকি দিয়েছেন বিস্তর, যাক লজ্জা পাবার কিছু নেই, নিজের মায়ের কাছে কি আর লজ্জা পেতে আছে? মাতৃভাষার সামনে লাজ-লজ্জার ধার ধারতে নেই দাদা! নাহলে দেখবেন হঠাৎ উরুভঙ্গ হয়ে গেছে!

ওহহ কি বলছেন! আপনাদের আজকাল বাংলা টা ঠিক আসেনা! সত্যি তো ভাববার বিষয় , তা সেই যুগের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা ফার্সি ;তার মানে পড়তে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন। হ্যা ঠিক ধরেছেন মুঘল যুগেও আমার নাম পাবেন আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে।

যাইহোক বই-টই তো অনেক হোল এইবার বলি আমি কিভাবে সাহেবদের সাথে জুড়লাম। চার্নক সাহেব হিজ্লির বনে আমাকে খুঁজে পেয়ে মুঘল আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছিলেন সেই গল্প আপনারা অনেকেই জানেন, তখন আমার দেখভাল করছে কলকাতার আদি বাসিন্দা সাবর্ণ চৌধুরীরা। তাদের থেকে সাহেব বাবু প্রজাস্বত্ব বাবদ কিনে নিল আমাকে! কত মূল্য জানেন?

ভূতের ভবিষ্যতে পরাণ বাবু যেমন ভিমরী খেয়ে বলেছিলেন পুরো জমিদারি ৫ হাজারের মধ্যে ঠিক সেই ভাবে বলছি আমার বিক্রয়মূল্য ছিল ৩০০০ টাকা মাত্র বছরে! আর উত্কোচ ছিল প্রায় আরো ১৭ হাজার! ভেবে দেখুন সেই ১৬৯৮ সালেও উত্কোচ ছিল- আজকেও আছে।তা, আমার বিক্রয়মূল্য বার্ষিক ৩০০০ টাকা উঠেছিল ভেবে হাত কচলাচ্ছেন, ইসস কিনে ফেলতে পারতেন আপনিও! নিশ্চয়ই পারবেন।শুধু একটু খূঁজে দেখতে হবে সেই বিরিঞ্চিবাবা কোন বাড়িতে ডেরা বেঁধেছেন, খোঁজ পেলেই কেল্লাফতে। আপনাকে সোজা ১৭০০ এ ফেরত পাঠিয়ে দেবে। আপনি ইংরেজ সাহেব কে ইনি-বিনি-আমি কলকাতা-কিনি বলে ভাগিয়ে দেবেন; এই তো ব্যাপার।

তা যাইহোক, এর পরের ইতিহাস আর বাড়াব না, অন্য একদিন সেই নিয়ে আবার হাজিরা দেব। আজ আমার জন্মদিন না ভেবে এমনিতেই কেক কাটুন, পায়েস খান সাথে পরলে এক দুই পিস সাদা ধবধবে রসগোল্লা ও পেটে পুরুন।

আমাক নিয়ে আনন্দে মাতুন; শুধু একটু দেখবেন আমি যেন প্রথম না হই: না মানে সবাই কে হারিয়ে আমি পরশু দূষণে দ্বিতীয় হয়েছি আপনাদের বদান্যতায়।

দেখুন যদি কিছু করতে পারেন। ভালো থাকবেন, আর আমার থেকে কিছু পান-না-পান সারাদিন খেটে-খুটে , জীবন যুদ্ধে প্রায় পরাস্ত হয়ে লড়াই ছাড়ব-ছাড়ব করছেন ঠিক সেই সময় ময়দান প্রান্ত থেকে সারা শহরে একটা ঠান্ডা মিষ্টি বাতাস দিয়ে আপনার সারা দিনের ক্ষতে মলম লাগিয়ে দেব, এটা "সিটি অফ জয়" এর অঙ্গীকার আপনাদের কাছে, হোক না সে বায়ু দূষিত, তবুও তাতে লেগে থাকবে ইতিহাসের স্পর্শ আর একটা ছোট্ট সুরে গুনগুন গান-
কলকাতা, তুমিও হেটে দেখো
কলকাতা, তুমিও ভেবে দেখো
যাবে কি না যাবে আমার সাথে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"