হারিয়ে যাওয়া সাপ।

গভীর রাত। সারাদিন কাজের শেষে পরিশ্রান্ত বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরে সুনীল সবে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, হঠাৎ শুনতে পেল ঢাকের আওয়াজ! হঠাৎ ঢাক বাজছে কেন?

এমনিতে আজ অফিসের বিশ্রী ঘটনায় মনটা তিত্কূট হয়ে গেছে। "অসৎ উপায়ে উৎকোচ এর বিনিময়ে কাজ করতে পারবে না" বলার সাথেসাথে ওর উপর নেমে এসেছে সহকর্মী দের রক্তচক্ষু। একযোগে সবাই জিজ্ঞাসা করে :
সবাই যদি উৎকোচ নিয়ে সানন্দে কাজ করতে পারে তাহলে সুনীলের অসুবিধা কোথায় উৎকোচ নিতে, ও কি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির নাকি?
সুনীল স্থিরচিত্তে জানায়: অসুবিধা আমার মনে,  আমি পারব না এ অন্যায় করতে, আমার মনের বিরুদ্ধাচরণ সম্ভব নয়।
সাথেসাথে কেউ শাসিয়ে,কেউ ব্যঙ্গ করে ওকে সারাদিন ধরে উত্যক্ত করে গেছে।শেষ সন্ধ্যায়  জানতে পেরেছে ওক বদলি করা হবে দূর প্রান্তরে!
- এই বিধ্বস্ত অভিজ্ঞতার পরে; দিনের শেষে পুজোর আগেভাগে এমন সুন্দর ঢাকের বাদ্যি ওর মনে বেশ দোলা লাগিয়েছে। কিন্তু কিসের জন্য এই রাতবিরেতে বাদ্যি বাজছে?

অবাক হয়ে সুনীল মা কে জিজ্ঞাসা করল :  মা এই রাতে ঢাক পেটায় কে? কি ব্যাপার আজকে?
সুশীলা দেবি রাতের রান্না করতে করতে মুখ না ঘুরিয়ে উত্তর দেয় আজকে তো শ্রাবণ সংক্রান্তি রে। সাহা বাড়িতে মনসা পূজো হচ্ছে। আমি বিকেলে গিয়ে প্রণাম করে এসেছি।
সুনীল মায়ের কথা শুনে মনে মনে বলে উঠল আজ  মনসা পূজো ছিল? সাথে সাথে এক স্মৃতিপট ভেসে উঠল মনের গহীণ কোণে।

ছোট্ট সুনীল মায়ের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে মনের হর্ষে এগিয়ে চলেছে, দিদার বাড়ি যাচ্ছে সকাল সকাল। মা বলেছে আজকে নাকি সাপ পূজো হবে দিদার বাড়িতে। ছোট্ট সুনীল ভেবেই পায় না সাপ তো মানুষ কে কামড়ে দেয়, ওদের কে আবার পূজো কেন করব? যাই হোক বিচিত্র ভবনা মাথায় নিয়ে মামার বাড়ি ঢুকল সে। ঢুকেই একটা পূজো পূজো গন্ধে আবৃত করল মন-প্রাণ।
সুনীল কে দেখেই মামা-মাসী রা দৌড়ে এল।এক হই হট্টমেলার দেশে যেন এসে পড়ল সুনীল। ওকে কোলে করে নিয়ে গেল ঠাকুর ঘরের সামনে, ঘরে লালপাড় শাড়ি পড়ে ভুবনমোহিনীর বেশে দিদিমা পুজোর সাজ সরঞ্জাম গোছাচ্ছে।  নাতি কে দেখেই আপ্লুত হয়ে আহ্লাদের সাথে বলে উঠল: ওরে আয় আয় সোনা দাদুভাই, কোলে আয়। কতদিন দেখিনি তোকে।
বড় মাসী পাশ থেকে বলে উঠল, ও আমরা বাইরের কাপড়ে ঠাকুর ঘরের সামনে এলে দূর দূর করো আর নাতির বেলা সব দোষ মাফ? দিদিমা চোখ রাঙিয়ে বলল: একদম ওর সাথে কেউ নিজেদের তুলনা করবি না! ও আমার সব থেকে আদরের ধন। ও যেখানে খুশী যেভাবে খুশী আসবে। আয় সোনা,কোলে বসো।

সুনীল বাধ্য ছেলের মতন ধপাস করে দিদার কোলে বসল। হঠাৎ ওর নজর পড়ল একি, সামনে আট খানা সাপ। আঁতকে উঠল! দিদা, ও দিদা আমার ভয় করছে খুব, এত সাপ!
দিদা হেসে বলল: এইতো মনসা ঠাকুর, মাটির অষ্টনাগ সাথে আছে।
সুনীল দিদাকে জড়িয়ে ধরে বলল অষ্টনাগ কি দিদু?  দিদু হেসে বলল: ওরা সব মা মনসার সন্তান সন্ততি। এই অষ্ট নাগেরও নাম আছে , শুনবে তুমি?
সুনীল আরো অবাক হয়ে বলল : সাপেদের নাম হয় নাকি দিদু?
দিদা হাসতে হাসতে বলল : হ্যা রে ওদের নাম আছে; অনন্ত-বাসুকী-পদ্ম-মহাপদ্ম-তক্ষক-কুলীর-কর্কট-শঙ্খ। এরা সব মনসা ঠাকুরের সন্তান।
সুনীল একটু কৌতূহলী মনে জিজ্ঞাসা করে :দিদু সাপ তো কামড়ে দেয়, ওদের আমরা পূজো করছি কেন?
দিদা ঠাকুরের দুধ-কলা-পাথর বাটি গোছাতে-গোছাতে বলে, দাদু ভাই আমাদের মনের ঠাকুর হল; মনসা। তোমার আমার সবার মনে দুষ্টু বুদ্ধি, রাগ মারপিটের চিন্তা সাপের মতন কামড়ে ধরে বুদ্ধি তে বিষ ঢেলে দেয়,তখন আমরা খুব ভূল কাজ করি!
তাই মনসা ঠাকুরকে পূজো করে বলি আমাদের মন থেকে সব দুষ্টু বুদ্ধি, বিষ হরণ করে নাও ঠাকুর।

সুনীল দিদার কথা শুনে শিশুমনে বলে ওঠে : দিদু, আমার-তোমার ভেতরের সাপ গুলো কোথায়? ওদের তো দেখতে পাচ্ছি না!
দিদা হাসতে হাসতে বলে : ওগুলো দুষ্টু মনের ভিতর থাকে। তুমি দুষ্টুমি না করলে ওরা চুপচাপ শুয়ে থাকবে দাদুভাই, দুষ্টুমি কোরোনা কক্ষনো, তাহলেই এরা জেগে উঠে ফোঁস ফোঁস করবে, বিষ ঢেলে দেবে মনে-বুদ্ধিতে, তখন তুমি আরো আরো অনেক দুষ্টু কাজ করবে।
সুনীল বাধ্য ছেলের মতন নিজের বুকে হাত দিয়ে বলল: আমি দুষ্টুমি করব না, সাপ তোরা ঘুমিয়ে থাক। আমি জাগতে দেবনা তোদের!

আজ কতযুগ কেটে গেছে, দিদা-দিদার বাড়ির পূজো সব হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে। হারিয়েছে সেই অষ্টনাগের প্রতিকৃতি, ঠাকুর দেবতার প্রতি টানও তেমন নেই সুনীলের।
তবুও একটি বিষয় হারিয়ে যায়নি! সুনীল এত বছরেও জাগতে দেয়নি মনের ভিতরের চির আশ্রিত সাপ-গুলো কে! সেই দুষ্টু সাপগুলো ওর মনে আজও চিরনিদ্রিত। সারাদিনের যে বিষস্মৃতি মনকে কষ্ট দিয়ে চলেছিল এক নিমেষে তা এক স্নিগ্ধ প্রত্যয়ের অমৃতে পরিণত  হলো পুরাতন স্মৃতিপটে।
ঢাকের আওয়াজ তীব্রতর হোলো। 

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"