তথ্যপ্রযুক্তির সংসার।।(পর্ব ২ : পর্ব এক এর লিঙ্ক গল্পে)

প্রথম পর্ব

পূর্ববর্তী পর্বে বলেছিলাম তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে - ভগীরথ এর মর্ত্যধামে গঙ্গা অবতরণের মতন; "প্রজেক্ট" নামক কর্মকাণ্ডকে সংস্থায় নিয়ে আসার কাহিনী। তা, প্রজেক্ট তো এসে গেল! কিম্তু এইবার এই বিশাল কর্মকাণ্ড কি ভাবে শুরু হবে বলুন তো?

চারদিকে সেই বার্তা রটে গেল ক্রমে।
স্ক্র‌্যচ থেকে একটি কর্মশুরু হবে এবারে।।

প্রথমেই, এই বিশাল কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য একটি দলের প্রয়োজন।  খোঁজ খোঁজ , কি-কি কাজ করতে হবে তার জন্য কিছু বিশেষ ধরনের মানুষ খোঁজা হয়। না-না, গুরুগম্ভীর নামের আড়ালে আমরা এদের চিনব না। বরং দেখব আর বুঝব এই ভূমিকা গুলো, এই চরিত্র গুলো আমাদের খুব চেনা, খুব আপন। বিশ্বাস হচ্ছে না! চলুন দেখি।

প্র‌জেক্টে প্রথমেই আসবেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যে সব বিষয়ে স্থির, প্রশ্ন করুন স্থির - কোড চালাতে বলুন স্থির। তিনি সদা নির্বিকার নিত্যানন্দ, কোনো বিষয়ে হেলদোল নেই। তিনি হলেন প্রজেক্ট এর বড়দা। দিনান্তে, তার হাত দিয়েই ধর্মরাজ্য স্থাপনের মতন স্টেটাস বার্তা দিকে দিকে প্রচারিত হয়।
দিনের সব বিষয়-আশয় গম্ভীর বেজায়,
খাটনি তে দিন কেটে যায়:
লেখা একটা সুন্দর বার্তা উপর মহলে ও ক্লায়েন্ট এর কাছে পৌছায়।
প্রতিদিন বিকেলের আলাপ চারিতায় ক্লায়েন্ট ও এনাকে বিশেষ ঘাটায় না, মনেমনে ভাবে কি উচ্চ বিচারের মানুষ আমাদের প্রজেক্টে এসেছেন; এনার নিশ্চুপ গাম্ভীর্য মনে শ্রদ্ধার ভাব যাগায়। এই স্থিতধ্বী প্রতিদিন দৈনিক আলাপচারিতা শেষ হবার আগে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এর মতন উদারতার সাথে বলে উঠবেন: এই শোনো আমরা অধর্ম করব না, আমরা ধর্মের পথে তথ্যপ্রযুক্তি করব- এই শুনে অপর প্রান্তে ক্লায়েন্ট আকুল হয়ে ব্যাকুল মনে বলে উঠবে: কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল , এমন মানুষ প্রজেক্ট এ এসে, সব কিছু বর্তে দিল।।

যাক বড়দা নিজের আসন গ্রহণ করলে
এইবার ভাবছেন পরিবারের মেজ কি করবে? আজ্ঞে না। মেজর সাহেব আসার আগে আরেক জন কে আনতে হবে। বড়দার নিশ্চুপতা আরেকজন পূরণ করবেন মধুর ধ্বনি তে।
এই ব্যক্তি আসল কর্ম পরিকল্পনা করবেন। কে, কিভাবে , কোন দিকে মুখ করে কোড করবে, কত ডিগ্রি কোণে কোডকে নিমজ্জিত করবে সব এর নখ দর্পণে! এর আরো একটা সুন্দর গুণ আছে:
মাধ্যমিকে ধুতরাফুল আর কূনোব্যাঙ এর পৌষ্টিক ত্ন্ত্রের ব্যবচ্ছেদ এর সুন্দর চিত্র অঙ্কন করে এত প্রতিভাসম্পন্ন হয়েছেন এখন যেমন খুশী এঁকে  তথ্যপ্রযুক্তির সম্পূর্ণ ব্যবচ্ছেদ করেন ,  তারপর আপন মনে রঙ্গীন কল্পনা চলে পুরো প্রজেক্ট ধরে। যেমন খুশী সাজাও; এই ধারনার বশবর্তী হয়ে এমন নতুন নতুন প্রযুক্তির খোঁজ দেয় যা এখনো ধরাধামে আবির্ভূত হয়নি।
এই পরিকল্পনা কারী ব্যক্তির আরেকটি রূপ দেখা দেয়, প্রতিদিন  বিকেলের আলাপচারিতার সময়।  ক্লায়েণ্ট প্রশ্নবানে জর্জরিত করলে তখনই এক অনির্বচনীয় বিশ্বরূপ দর্শন করান এই পরিকল্পনাকারী। প্রতিদিন তার চিত্রকলা প্রদর্শন করেন হৃষ্ট চিত্তে উদ্ভাসিত হয়ে;  শেয়াল পন্ডিতের কুমীর ছানা দর্শানোর মতন।
ক্লায়েন্ট ঐ আলোক্জ্জ্বল জ্যোতিরছটা চিত্ররূপ  দেখে সব ভূলে যায় , কোথায় প্রজেক্ট শুরু আর কোথায় শেষ সব ভূলে অভিভূত হয়ে মনে মনে ভাবে : এ কি দেখিলাম, এ জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না!
যাক এই পরিকল্পনা কারী এইবার দায়িত্ব নিয়ে নেয় প্রজেক্ট এর। বড়দার এনার উপর অগাধ সম্ভ্রম। 
পরিকল্পনাকারী, এরপরে প্রজেক্টে কাজের জন্য এক এক করে বাকিদের ডাক দেয়। খুঁজে খুঁজে
একজন মধ্য বয়সী শক্তপোক্ত মানুষ কে ধরে নিয়ে আসে, যে একা কাধে সারারাত জেগে কোড করবে, আবার সকাল নটায় মিটিং মিছিলে ঢুকবে।
এই মানুষটা র জীবনে কোনো মার প্যাঁচ নেই,-কোডেও নেই। জয় হনুমান বলে এক জায়গা থেকে তথ্য তুলবে আর আরেক যায়গায় আছাড় দিয়ে ফেলবে, রাস্তায় কোনো কিন্তু-পরন্তু কোথায়-কখন কিচ্ছু নেই,  ক্যাপ্টেন স্পার্ক এর মতন সোজা রাস্তায় চলছে চলবে, শুধু সপ্তাহান্তে এক প্লেট সুরভিত বিরিয়ানি চাই। ব্যস তাহলেই দিলখুশ।

কর্মক্ষম ব্যক্তি এসে গেলেই এবার পরিকল্পনাকারী নিয়ে আসবেন মুখ্য চরিত্রকে। "মিট আওয়ার বিলভেড সর্বশ্রেষ্ঠ কোডধারী" বলে সম্ভাষিত হয়ে কুরুক্ষেত্রের কোড ক্ষেত্রে ঢুকবে দুই হাতে কোড করতে সক্ষম এক চরিত্র। এই ব্যক্তি প্রতিদিন লিঙ্কডিনে আপডেট দেবে আজ আমি এই সার্টিফিকেট করে ধরাধাম কে ধন্য করলাম, কালকে আবার নতুন কিছু করব, সঙ্গে থাকুন।
এই চরিত্র দের এত বিষয়ে ব্যুত্পত্তি ঘটে, শেষে আসল কাজের সময়ে বলে:  "আমি  না এই কোর্স করিনি মনে হচ্ছে। আজকে কোড চলবে না,  রাতের মধ্যে কোর্স করে কালকে কোড চালিয়ে দেব।"
এই সময়ে পরিকল্পনা কারী আসরে নামেন। প্রথমে বলে ভাই একটু ব্যাগ ঘেটে দেখ তুই তোর নিজস্ব তথ্যে বলেছিস এইগুলো জানিস। কিন্তু, আত্মবিস্মৃত সর্বশ্রেষ্ঠ কোডার বলে সব ভূলে গেছি দাদা। আমি কোড করতে পারব না ।
পরিকল্পনাকারী মনে মনে ভাবে পুরো নার্ভাস ব্রেকডাউন কেস! উফ্ফ আবার একে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভ্দ্রের সুরে "জাগ জাগ তুমি" বলে ডাকাডাকি করতে হবে। এর পর পরিকল্পনাকারী
প্রথমে ডকুমেন্ট আর নিজের অডিও যোগে গমগম করে বোঝায় কি কি করতে হবে। ব্যাটা তবুও বোঝে না!
তখন পরিকল্পনা কারী অনুধাবন করে এ ভাবে হবে না। একে আজ ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বরূপ দেখাতে হবে, নিজের মোবাইল থেকে কোর্স ভিডিও খুলে দিতেই সর্বশ্রেষ্ঠ কোডার বলে ওঠে আমার কর্মযোগ শুরু ; জ্ঞানচক্ষু খুলে গেছে দাদা। "অ এ অজগর আসছে তেড়ে, নর: - নরৌ- নরা:, এক এক্কে এক , সি জাভা হ্ন্লুলু সব মনে পড়ে গেছে" - দু মিনিটে করে দিচ্ছি!!
পরিকল্পনাকারী মুচকি হেসে বলে: তাহলে সেন্টু খেলি কেন ভাই? কাজ কর ,তোকে আমি ড্রাইভ করব অসুবিধা নেই। আবার আটকে গেলে বলিস।

এইবার পরিকল্পনা কারী খোঁজ করেন এমন এক চরিত্র যে কোনোদিন সার্টিফিকেট করেনা কিন্তু দিনের কাজ দিনে করে , যা দরকার চুপচাপ ফুলে ছাপ দিয়ে দেয় আড়ালে আবডালে থেকে। প্রথম তিন-চার চরিত্রের ছটায় মনেই হয়না এই ব্যক্তির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আলোচনা থেকে রাজদ্বারে যেখনেই প্রজেক্ট আটকে যায় এই ব্যক্তি "য তিস্ঠতি স বান্ধব:" উদ্ধার করবে। মনে মনে গান করবে : কিচ্ছু চাইনি আমি, প্রজেক্টে একটু সম্মান ছাড়া।।

এরকম চতুর্থ বীতরাগ মানুষের সন্ধান পেলেই পরিকল্পনাকারী ভাবেন কাজের লোকজন এসে গেছে, কিন্তু প্রজেক্ট এ যে একটা অনবদ্য অভূতপূর্ব কিছু ঘটছে সেইটা প্রচার করতেই হবে,
উপরের মহল যাতে কর্মকাণ্ড দেখে উদ্বেলিত হয়ে বলে ওঠে: দেখ্তাছ, এই প্রজেক্ট টা কেমন ওয়াহ ওয়াহ না।"   উপরের মহল এই সব না বললে এই প্রজেক্ট এর মান পড়ে যাবে যে ।কি করা যায়?

তারপর চোখ বন্ধ করে ভেবে নেয় পরিকল্পনা কারী। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ভবিষ্যত দ্রষ্টা কোডিং এ পারদর্শী ছোট্ট দেবশিশু কে প্রজেক্ট এ আনা হয় , এর আবার বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা বলে এসেই বলে দেবে এই প্রজেক্ট থাকবে না মুখ থুবড়ে পড়বে। পরিকল্পনাকারী এর গুণে মুগ্ধ হলেও কড়া আদেশ দেয় প্রজেক্ট এর ভবিষ্যত বাণী যেন অন্য কেউ না জানে, অন্য কেউ জানতে পারলে মুণ্ডু ভেঙ্গে দেবে পরিকল্পনাকারী!

বেচারা ভয় টয় পেয়ে ভাবে কোথায় এসে ঢুকলামরে ভাই। দেখি আজকে "রাক্ষস কম পড়েছে" সাইটে ঢু মারতে হবে!

যাই হোক এরকম চরিত্র এলেই প্রজেক্ট শুরু হবে কিন্তু একটি বিশেষ চরিত্র না হলে প্রজেক্ট এর গুণমান একদম বাড়বে না। এই চরিত্রে আগুনের মধ্যে কোড কে উল্টে পাল্টে দেখবে কোড চলছে না অন্তিম শ্বাস সুন্দর বলছে।  এর জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে: 
আগুনের পরশমণি ছোয়াও কোডে।
এই কোড ভূল প্রমাণ কর ।।
ইনি, প্রত্যেক ক্ষণে প্রমাণ করবেন পঞ্চ চরিত্র ভূল করছে । যতক্ষণ না এই পরীক্ষক চরিত্র খুশী হচ্ছে রেহাই নেই।
ইনি যখন একটি দুটি করে ভূল ভ্রান্তি ধরছে বড়দা, মেজদা গদগদ হয়ে মেনে নিলেও তৃতীয় সুর আপন মনে কোড করেই চলে; ফিরেও দেখে না ভূল ভ্রান্তি, সেই ভূল গুলো ঠিক করে চতুর্থ গোবেচারা চরিত্র। পঞ্চম চরিত্র এসে জ্ঞান দেয় পরীক্ষক এর বিশ্লেষণ এইবার থেকে স্বয়ংক্রিয় হওয়া উচিৎ, যেই পরীক্ষক চোখ বড় করে তাকায় সাথে সাথে বলে না না, স্বয়ংক্রিয় করলে ভূল থেকেই যাবে। মনুষ্য সপর্শ অবশ্য প্রয়োজন বলে চম্পট দেয়। পরিকল্পনা কারী আবার এই পরীক্ষক এর বিশেষ বন্ধু। পঞ্চচরিত্রের উপর অত্যাচার বেড়ে গেলে পরিকল্পনা কারী এসে পরীক্ষক এর হাত ধরে বলে
মিল্হে সুর মেরা তুমহারা।
কসুর মাফ কর ভাই এই পাঁচ কা।।

তবে , পরীক্ষক এর মনেও দু:খ হয় , এক মাত্র একটি চরিত্র একে বিশেষ পাত্তা দেয়না : সর্বশ্রেষ্ঠ কোডার আর পরীক্ষক প্রজেক্ট এ কখনো সবুজ সাথী হয়ে একসাথে সাইকেল চড়তে পারেনা। এ এক অলিখিত নিয়ম! 
যাই হোক দল প্র্স্তুত: পরিকল্পনাকারী পঞ্চ চরিত্র ও পরীক্ষক কে নিয়ে শুরু হোক-    মহাসংগ্রাম :প্রজেক্ট।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"