ময়দানের জার্মান।।
"কিরে, তোরা তো আই লিগ স্পর্শ করতে পারিস নি! তোরা তো আজকাল নিজেদের যোগ্যতায় টুর্নামেন্টও খেলতে পারিস না।"- পাড়ার চায়ের দোকানে ইস্টবেঙ্গল সমর্থক পল্টুকে উদ্দেশ্য করে এক-এক বক্রোক্তি ছুঁড়ে দিচ্ছিল রনি , টুবলু।
বেচারা পল্টু, মুখ কালো করে ফুঁসছে। সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছে না, মনে মনে ভাবছে এক ঘুষি তে এই ব্যাটা দের দেই চুপ করিয়ে, রাগের চোটে বলে ওঠে : চুপকর, বেশী কথা বলছিস! নির্লজ্জ ভাবে নিজের মাতৃসম ক্লাব কে তোরা অন্যের নামে ব্যবহার করছিস, কি সব রিমুভ-রিমুভ করে বেড়াচ্ছিস। তোদের মতন নির্লজ্জ অন্তত নই আমরা। বলেই অন্যদিকে তাকিয়ে রইল পল্টু।রবিবার সকাল সকাল, পাড়ায় চায়ের দোকান বাংলার চিরন্তন ময়দানি লড়াই এর গনগনে আঁচ অনুভব করছে।
পল্টুর কথা শুনে টুবলু চোখ পাকিয়ে বলল : ভাই, নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা কথাটা তোদের জন্যেই খাটে। নিজেরা পারিস না খেলতে , আগে খেল ভালো করে ! পল্টু নিরাসক্ত ভাবে বলে: সে তোরা এখন জিতছিস তোদের খই ফুটবেই। টুবলু উত্তর দিল: দেখ জেতা-হারা না। তোরা দেখেছিস তোরা কিভাবে খেলছিস? তোদের দলে প্লেয়ার গুলো কে নিচ্ছিস, কিন্তু যে যার মতন আপন মনে খেলছে! দেখে মনে হচ্ছে এরা জীবনে বলেই পা দেয়নি। কিন্তু, সেই খেলোয়াড় দের ছেড়ে দিলেই অন্য দলে গিয়ে তারা দারুণ খেলছে! দলের মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক হচ্ছেই! তোদের তো আজকাল খেলার সিদ্ধান্ত ক্লাব থেকেও হয় না। নিজেরাই জানিস না কোনো টুর্নামেন্ট খেলবি কি খেলবি না । এইভাবে চলে নাকি!
পল্টু বিরস ভাবে বলে: সত্যিই আমাদের দল কোনো ভাবে লড়তেই পারছে না। আমি নিজে মাঝে মাঝে ভাবি এটা কি আমার সেই আগুনখেকো দল যে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ত না কাউকে! ভালো লাগেনা আজকাল আর! হারছে, সেই জন্য কষ্ট হবেই।
কিন্তু হারার যন্য বিতৃষ্ণা আসেনি; এসেছে দলের অত্ভুৎ আচরণে। যে দলের সাথে লড়াই কথা টা সমার্থক ছিল সেই দল আজকে কেমন লুকিয়ে চুরিয়ে পিছনের গেট দিয়ে মাঠে ঢুকছে! এর থেকে বড় কষ্ট-অপমান কি হতে পারে বলতো?
তাই দল কে ভালোবাসলেও এই পদ্ধতি ও ধরন-ধারণ ভালো লাগছে না। তাই এঁড়ে-তর্ক করছি না , মেনে নিচ্ছি এই ইস্টবেঙ্গল কে সত্যি আমি চিনি না।
কিন্তু যা বললাম, তোরাও বলত তোদের ঐতিহ্য কোথায় গেল? যে মোহনবাগান এর সাথে হারলে আগে কেঁদে দিতাম আজকে তোদের কাছে হেরেও কান্না আসেনা, মনে হয় : একটা কোম্পানির কাছে হেরেছে। এতো একটা বানিজ্য পরিকল্পনা শুধু হাতছাড়া হওয়ার মতন ব্যাপার। আবেগটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে!!!
রনি শুনে বিজ্ঞের মতন বলল :হমম, পল্টু, তোদের সমস্যাটা অনেক গভীর। দেখ প্রতিপক্ষ শক্ত শুধুমাত্র মাঠেই কি হয় ? আগে তোদের হারিয়ে কি উল্লাস করতাম! এখন মাঝে মাঝে মনে হয় কাকে হারিয়ে উঠলাম? খেলার প্রতিপক্ষ থেকে মনের কোণে ঘুরে বেড়ায় এতো রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ এক প্রতিচ্ছায়া, যে এক লড়াই নামক মহিরূহের আড়ালে নামছে। সত্যি বললে তোরা শেষ হয়ে গেছিস, ক্লাবটা তুলে দে ভাই!
রনি-পল্টু-টুবলুর কথা মন দিয়ে শুনছিল হরি দা। চায়ের দোকানটা ওরই। চা বানাতে বানাতে হঠাৎ চিৎকর করে হরি দা বলল : চুউপ কর পোলা গুলা কি কস! একদম এই সব ননসেন্স এর মতন কথা কৈবি না কৈলাম! তদের কথা শুইন্যা আমার পরাণ ডা, পাষাণ হইতেছে রে।
টুবলু একটু অবাক হয়ে বলল : যা ব্বাবা, তুমি এমন ফোঁস করে উঠলে কেন হরি দা? তুমিও কি কাঁটাতার কেস নাকি?
হরি দা গম্ভীরভাবে বলল: হ্যা রে, আমিও কাঁটাতার পার হইয়াই আইছি, বাঁচতে চাইছি তাই আইছি। ভগবান বাঁচাইছে তাই বেঁচে আছি, মরলে তো সেদিনিই মরতাম, কিন্ত লড়তে শিখ্যা গেছি।পল্টু টুবলু র দিকে তাকিয়ে বলল: তুই চুপ করতো, সব সময় মাতব্বরি তোর,হরি দা- তুমি দলের জন্য কষ্ট পাও?
হরি দা উনুনের আঁচ বাড়িয়ে দিল। ফর্সা হলদে মুখে গনগনে লালচে আভা। তারপর স্থির হয়ে বলল:
মিলিটারির তাড়া খাইয়া এক কাপড়ে মা, ভাই রে লইয়া আইয়া পড়ছিলাম এই শহরে। বাবা রে ওরা মাইর্যা দিছিল। কি করুম কি জানি; উদভ্রান্ত সেই অব্স্থায় ক্যাম্প থেইক্যা জীবন যুদ্ধ শুরু হইল। পরের দিন কি খামু, কি পরুম কিচ্ছু জানিনা।
যে মা রাজরাণী হইয়া ছিল সেই মা এইহানের পাপড় তৈরী কারখানা তে কাম নিল, আমি চা এর বাক্স লইয়া বেড়াইয়া পড়লাম। ওহনে এইট কেলাস অব্ধি পড়ছিলাম, সব ছেদ হইল।
এই ভাবে ঘুরতে ঘুরতে চা ফেরি করতে করতে শুনলাম আমাগো ওপারের মানুষ দের এক দল আছে, হ্যরা আমাগো নামে বল খেলে। একদিন কি মনে হইল মাঠে উপস্থিত হইলাম। অন্যযায়গায় চায়ের ফেরি করতে করতে দেরি হইয়া গেছে। চায়ের সরঞ্জাম লঐয়াই মাঠে ঢুকে গেলাম। দেহি, জনসমুদ্র ।
তখন তো ৭০ মিনিট এর খেলা হৈত, পুরা খেলা; গিয়া দেখি ৫০ মিনিট হইয়া গেছে, আমাগো দল ১ গোলে পিছয়া পড়ছে। মনে মনে ভাবলাম, হা ঈশ্বর আমি কি এই হার দেখোন এর জন্যই আইছিলাম! এক বিন্দু আনন্দ ও কি আমার জ্ন্য নাই। আমারে দেইখ্যা একজন জিগাইল, প্রথমবার আইছ? মাথা হিলৈয়া সম্মতি জানাইলম।হে কইল এইবার চোয়াল শক্ত কইর্যা দেখ। আমি বুঝলাম না, কেন চোয়াল শক্ত করুম কেন? সে কিছু না কৈয়া মাঠের দিকা চাইল। আমিও মাঠের দিকেই মনোনিবেশ করলাম।কি দেখলাম জানস?পল্টু ব্যগ্র চিত্তে উত্তেজিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল: কি দেখলে হরি দা?
হরি দা বলল: জ্যান এগারোডা বাঘের বাচ্চা আগুন জামা পড়ে রক্তরাঙা গনগন আঁচের মতন দৌড় দিল মাঠ জুড়ে। হেই কি আনন্দ রে; চক্ষের নিমিষে দেখি একের পর এক গোল হৈছে। আমি হেই আনন্দ তোদের বুঝাইতে পারব না রে!
দ্যাশ ছাড়া, বাবারে হারান, ভবিষ্যতের চিন্তা, লেহা-পড়া ছাড়ার সব কষ্ট ভবনা যেন দল টা আমার ভিতর থেকে নিমেষে উগরাইয়া দিল, হাউ হাউ কৈর্যা কান্দ্লাম আনন্দে। এত দু:খ চাপা ছিল বুঝি নাই রে! দল শিখাইল আমরা মড়ার আগে হারতে পারিনা, লড়ুম যতক্ষণ আছি।
আমরা সেই দিন জিতলাম। বাড়ি আসতে আসতে রাস্তায় সেদিন সবাই রে বিনামূল্যে চা দিলাম। মা রে কইলাম আমরা জিতছি , মা ও আমার মতন বৈচ্যা উইঠল। ভাই বায়না করল ও ও যাইব। পরিবারে অনেক দিন পরে উচ্ছ্বাস আইল। এর পরে খেলা থাকলে আমি আর ভাই যাইতাম। মা, কোনোদিন ময়দানে যায় নাই। কিন্তু খেলার ফল জেনে আনন্দ- দু:খ করত নীরবে, নিজের মনে। জিতলে বলত যা হরি অনেক দিন ইলিশ খাই না, একটা লইয়া আয় বাজার থিক্যা। হারলে সেদিন রাতে আমাগো খাইতে দিয়া নিজে খাইত না। পরের দিকে খবরের কাগজে দেখত খেলার বিষয় , কি বুঝত জানিনা কিন্তু চুপচাপ দেখত।
সেই থেইক্যা আমি দলের খেলা দেখতে যাই, কামাই করি নাই । অহন তো সল্টলেকে খেলা হয় না, তাই যাইতে পারিনা।
তুই বল পল্টু এই দল শ্যষ হইতে পারে? এ দল আমাদের লড়তে শিখ্যৈছে, এ দল মরবে না । এ দল থাকবে, আমরা চলে গেলেও রৈয়া যাইব। এ দল, আমার মতন মানুষ দের দু:খ অভিমান- গরলেরে গলে ঢাইল্যা নীলকণ্ঠের মতন হইছে, এ দল মরবো না। লড়ব আবার ফিরব। এই বলে হরি দা চা এর খুড়ি গুলো সাজাতে লাগল চা ঢালবে বলে।
টুবলু হরি দার কথা শুনে কাঁপা গলায় পল্টুর দিকে তাকিয়ে বলল , এই জন্যেই তোদের
ময়দানের জার্মান বলে।
আমরাও প্র্স্তুত, তোরাও আয়, তোদের পুর্ণশক্তি তে না হারিয়ে মজা পাচ্ছিনা। আয়, মাঠে দেখা হবে।পল্টু হেসে বলল যেদিন তোদের মারব পঞ্চ শূণ্য ভুলিয়ে দেব।
রনি হেসে বলল ওরে নিজদের দুর্গ বাঁচা আগে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার। দুই দলের সমর্থক রা একে অপরের কাছে সম্পূরক, পুরো চাঁদ সদাগর আর মনসা। ইস্ট মোহন সমর্থকদের দুজনের দুজনকে চাই। দুজনেই দুজন কে মনে মনে এটাই বলে:
"যেই হাতে পূজি আমি দেব শূলপাণি।
সেই হাতে না পূজিব চ্যাংমুড়ি কানি।।"
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন