"নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ"
"কিরে সকাল সকাল খবরের কাগজে মুখ বুজে কি এত মুখস্থ করছিস ছোটন? দূর থেকে আসতে আসতে দেখছি নিমগ্ন চিত্তে কাগজের মধ্যে ঢুকে গেছিস তুই। কি ব্যাপার" বলেই ছোটন এর পাশে বেঞ্চের উপর ধপাস করে বসে পড়ল পাপাই। বসেই এক হাঁক পাড়লো "হরি দা একটা চা দাওতো জলদি জলদি "।
ছোটন এবার খবরের কাগজটা ভাঁজ করে চিন্তিত ভাবে বলল : কি আর বলব! আজ কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে শুধু বিষাদময় মৃত্যুর হাহাকার। একদিকে প্রাকৃতিক তাণ্ডবে মেঘভাঙ্গা বৃষ্টিতে অনেক মানুষ হারিয়ে গেছেন চিরতরে আবার আরেকদিকে দেখ এক প্রাক্তন দেশপ্রধান আততায়ীর গুলিতে নিহত! কি ভয়ানক অব্স্থা ভাবতে পারছিস? এই গুলো পড়েই মেজাজটা গেল কেমন দুমড়ে মুচড়ে। "
পাপাই ছোটন এর মুখপানে চেয়ে বলল আচ্ছা এই ব্যাপার, "বাবুর আজ মানুষের মৃত্যু দেখে মন কেঁদে উঠছে"।
ছোটন উত্তর দেয় : ঠিক কান্না না রে, বিচলিত বলতে পারিস! এই ভাবে এঁনারা মারা গেলেন। একদল ছিল পুণ্যার্থী আরেক জন ছিলেন সদ্য প্রাক্তন দেশপ্রধান অমিত ক্ষমতার শীর্ষে,কিন্তু কেউ আঁচও পেলেন না আগের মুহূর্ত অব্ধি যে সামনের পলকে এই বিশ্বচরাচর থেকে যাবে কিন্তু এঁরা আর থাকবেন না! কি বিস্ময়কর এক উপসংহার ভাবলেও বুক কেঁপে উঠছে রে।
পাপাই বলে ওঠে: তোর চিত্ত বিচলিত কেন বুঝলাম। আমার কিছু মতামত আছে সেটা তোকে বলতে পারি। তবে এত ভাবিস না সকাল সকাল! আর হরি দা বলছি চা কি বাগান থেকে পাতা তুলে দেবে? দাও জলদি , চা না এলে ছোটন এর মেজাজ টাও ঠিক হবে না।
হরি সদাহাস্যময় মুখে বলল : দিচ্ছি গো দিচ্ছি ,এই তো দুধ জুড়াইয়া আইলো। তোমরা গপ্প করতে থাকো, তবে ছোটন দাদাবাবু ঠিকই কৈছে গো। অমন সন্দর দ্যাবতুল্য রাজা মানুষ, অমন বাবার দুয়ারে যাওয়া মানুষ গুলান ক্যামনে উপরে চইল্যা গেল হঠাৎ। তুমি কি বলছিলে বল পাপাইদাদাবাবু। আমি চা দিত্যাছি "।
চা প্রাপ্তির আশ্বাস শুনে পাপাই ধীরেধীরে শুরু করল: আচ্ছা বলছি।
এই ছোটন তার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দে তো। সারাদিনে তোর মতে, সব থেকে শান্তির কাজ কি ?
ছোটন বলল: কি আবার পূজো করি, মাঝে মাঝে স্বেচ্ছাসেবি কিছু কাজ করি। একে ওকে একটু সাহায্য করি এইগুলোতে বেশ শান্তি পাওয়া যায়।
পাপাই বলল: আচ্ছা বেশ। তবে এইগুলো কি প্রতিদিন করিস নিয়ম মেনে? মানে একদিন দুদিনও কি এরকম হয়না যে এই কাজ গুল করা হল না। একটা শান্তির যায়গা সেদিনের জন্য তোর ক্ষেত্রে কোনটা মনে হতে পারে।
ছোটন: হমম বুঝেছি, দেখ যতো কাজ করি, অকাজ করি দিনের শেষে ঘুমটাই একমাত্র যায়গা যেখানে শান্তির স্পর্শ থাকে।
পাপাই বলল: বা, ভালো বলেছিস তো নিদ্রা শান্তির স্থান। নিদ্রা নিয়েই তাহলে বলছি;
সকালে উঠে মানে একদম ঘুম থেকে উঠে সর্বপ্রথম কি কি করিস বলতো ?
ছোটন হেসে উত্তর দিল : কি আবার করব । চোখ খুলি ,তারপর আরেকটু ঘুমাতে ইচ্ছে হলে আমেজটা ধরে রাখি : তন্দ্রা আছে নিদ্রা নাই এইভাবে। তারপর উঠে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হই চারদিকের সাথে। দিনের কাজ শুরু করি,এইতো ব্যস এটাই করি।
পাপাই বলল: একদম ঠিক। ঘুম থেকে উঠে ঐ সময়ে প্রথমে তুই ধীরে ধীরে ধাতস্থ হোস। এইবার একটু ভেবে দেখ তুই যতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলি তোর আশেপাশে র পরিবেশ এক থাকলেও তুই সেটার সাথে সংযুক্ত ছিলিস না। কিন্তু যেইমুহূর্তে তোর ঘুম কাটলো তখন থেকেই বিশ্বপ্রকৃতির সাথে তোর সংযুক্তিকরণ শুরু হল।
তোর নিদ্রামগ্ন সময়ে তুই জানতেই পারিসনি আশে পাশে কি পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তন এর স্পর্শ আসছে ঘুম ভাঙ্গার পরে পর্যবেক্ষণ এর মধ্যমে।
ধীরে ধীরে নিজের শরীর- থেকে শুরু হয়ে ঘর- ঘরের বাহির তারপর সমগ্র বিশ্বে শেষ সাত আট ঘন্টায় কি হয়ে গেছে সেই বিষয়ে জানতে তুই তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাস। ঠিক কিনা?
ছোটন ভুরুকুঁচকে বলল: হ্যা সেতো একদম ঠিক। কিন্তু ভাই এখানে মৃত্যু কোথায়? এতো প্রতিদিনের ঘুমের কথা বলছিস!
পাপাই হেসে বলল : আছে বন্ধু ; এর মধ্যেই তোর নিজের প্রশ্নেই অবচেতনে উত্তর টা আছে।
ছোটন অবাক হয়ে বলল: সেটা কি ভাবে আছে? একটু বুঝিয়ে দে।
পাপাই ধীরস্থির হয়ে মধুর লয়ে বলল: দেখ তুই প্রতিদিন যখন ঘুমিয়ে থাকিস তুই তো তখন বিশ্বসম্পর্ক রহিত হয়ে যাস, সেই মূহূর্তগুলো তুই থেকেও কিন্তু নেই। কারণ তুই তোর পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে স্থান কাল পাত্র কে পরিমাপ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হবার অব্স্থায় নেই, অনেকটা জড়বৎ আচরণ।
কোনো জীবিত সত্ত্বা যদি জড় এর মতন আচরণ করে সেই সময়ে সে প্রায় জীবন্মৃত অব্স্থায় আছে। প্রতিদিন রাত্রেই কিন্তু এই অব্স্থা প্রাপ্ত হচ্ছিস । আবার জেগে উঠে সব কাজ করছিস প্রাণ ফিরে পাচ্ছিস ধড়ে । একবার নিজেই এইবার ভেবে দেখ মৃত্যুর মতন একটা বিষয় কিন্তু তুই প্রাত্যহিক নিয়মে অনুধাবন করছিস। কিন্তু এই নিদ্রা রুপী সাময়িক মৃত্যুচেতনাতে তোর কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে, এতে কি সেই মুহূর্তে তুই ভীত সন্ত্রস্ত হচ্ছিস? হচ্ছিস না কারণ, তুই সেই নিদ্রাপর্বে চেতনার স্তরেই বা সিদ্ধান্তের স্তরেই থাকছিস না। এক শান্তির তপোবনে বিরাজ করছিস।
এইবার দেখ কেউ যে মুহূর্তে মৃত্যুকে পুরোপুরি আলিঙ্গন করে সে তো আর সিদ্ধান্তের পর্যায়ে নেই।
ছোটন ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল: তাহলে মৃত্যু কে ভয় পাই কেন আমরা, আর নিদ্রা কে কেন এতো ভালবাসি?
পাপাই গম্ভীরভাবে বলল: কারণ নিদ্রা তে তুই জানিস কাল সকালে আবার তুই উঠবি,পরিবর্তনের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবি। মৃত্যুতে সেই পরিবর্তনের আস্বাদন বন্ধ হয়ে যাবে মানুষের চেতনায়, সেই আগামীকালের পরিবর্তনের দিনে থাকতে পারব না ভেবেই ভয়টা কাজ করে, নতুন অভিজ্ঞতা, জ্ঞানআরোহণের সুযোগ হারিয়ে ফেলার বেদনায়।
কিন্তু ভেবে দেখলে মৃত্যু প্রতিদিন আমাদের সাথে সাময়িক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেই রেখেছে নিদ্রার মাধ্যমে। প্রতিদিনের শান্তিই কিন্তু অন্তিম সত্য।
ছোটন বিহ্বলতার সাথে বলল: যার মৃত্যু হচ্ছে সেই স্বয়ং; মৃত্যু আর নিদ্রার মধ্যমে নিজের অব্স্থানকে বুঝতে পারল । তোর এই ব্যাখ্যাটা বুঝলাম।
কিন্তু কারোর মৃত্যুতে কষ্ট কেন হয়?বা নিজের কেউ চলে গেলে শোকে আকুল হয়ে যায় কেন?
পাপাই উত্তরদিল: এইখানেও সেই এক ব্যাপার ভেবে দেখ। সেই প্রতিদিনের পরিবর্তনের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা হারিয়ে যাওয়ার বেদনা।
প্রত্যেক মানুষ এক একটা ভাবে এক একটা মনে তার পারিপার্শিক অব্স্থা কে অনুধাবন করে। সেই বিশেষ অবলোকন অভিজ্ঞতা তুই অন্য কোথাও খুঁজে পাবিনা। এক বিষয় এর সারাংশকে ভিন্ন ভাবে ভিন্ন মানুষ উপলব্ধি করে। এখন সেইখানে কোনো মানুষ যদি হারিয়ে যায় তারমানে তার সেই বিশেষ দৃষ্টি টাই হারিয়ে গেলো, যা আর নতুন কোনো বিষয়এর উপর আলোকপাত করবে না। নতুনপ্রাতে সেই আপনজনের উপস্থিতি নেই; সেই মানুষ টার থেকে তুই নতুন কিছু শুনতে শিখতে জানতে পারবি না। এই হারানো থেকেই বেদনা বিরহের সৃষ্টি হয় এবং এটাই স্বাভাবিক, তাই কেউ চলে গেলে আমাদের মনে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
প্রত্যেক মানুষই কিন্তু দেশ জাতি কাল ধর্ম সব কিছুর উপরে। কারণ, প্রত্যেক মানুষের দৃষ্টিকোণ স্বতন্ত্র। সেই স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি কখনো সমাজে, কখনো পরিবারে, কখনো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে এক নতুন নতুন আঙ্গিকে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। তাই মানুষ হারালে মনোকষ্ট হয় । এই বলে পাপাই চুপ হলো ।
ছোটন উদাসভাব বলল: ঠিক বলেছিস তুই। মৃত্যু ধ্রুব সত্য, মৃত্যু ভয়ও বাস্তব, বিরহ বেদনাও সত্য । তোর কথাগুলো শুনে সকালের হাহাকার টা একটা নিশ্চুপ বেদনার ফল্গু নদী তে পরিণত হয়ে মন মাঝে গোপনে রয়ে গেল। পাপাই বলল : একদম তাই সব মৃত্যুই শেষে সময়ের লুনী নদীতে ভেসে অন্ত:সলিলা হয়ে রয়ে যাবে মনের মাঝে। কৈগো হরি দা চা তো এখনো এল না! চা কি আমরা খাবনা? কিছুপরে হরি দা নীরবে চা দিয়ে গেল। তারপর ফিরে গিয়ে রেডিওর আওয়াজ টা একটু বাড়িয়ে দিল।
হরি দার চায়ের দোকানে রেডিও তে বেজে উঠল কবির গান:
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন