অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে।তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে ।।
সারা রাজ্য শুদ্ধ মানুষের এখন অনেক রাগ। অনেকের রাগ ক্ষমতার অপব্যবহারের উপর , কারোর রাগ অন্যায়ে সামিল সুবিধাভোগী, পরচাকুরী খেকো মানুষ গুলোর উপর। কেউ কেউ বিষম রেগে গেছে সমাজ প্রতিবাদ ভূলে মিনমিন করে মিম-মিম খেলছে এই দেখে। প্রায় সবাই রাগ করছে সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যার জন্য পাঁচশ দুই দিন যোগ্যরা রাস্তায় বসে কাদছে। রেগে সবাই আছে! কিন্তু কেউ রাগে ফেটে পড়ছে না!!!!
আচ্ছা প্রায় তিনহাজার বছর আগে একবার দেখুন তো এরকম রাগ কার কার হয়েছিল?
মনে পড়ল, এক বৃদ্ধের হয়েছিল । যে পরিবারের জন্য তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন, পরিবার কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাইরের দুনিয়ার সাথে প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে অপরাজিত ছিলেন তিনিও নিজের নাতবৌ এর অপমানে চুপ ছিলেন। প্রচন্ড ক্রুদ্ধভাবে নিজেই নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছিলেন ; কিন্তু ফেটে পড়েন নি নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে।
তার পাশে বসেই আরেক বৃদ্ধ, বন্ধুর কন্যা নিজ কন্যাসমা, ছাত্রবধূ র অপমান দেখে রাগে লোহিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু বৃত্তি ভোগের কারণে ফেটে পড়লেন না। কার বিরুদ্ধে ফেটে পরবেন ক্ষোভে? যে রাজা তাঁকে দু:সময়ে বৃত্তি দিয়েছে, কাজ দিয়েছে সম্মান দিয়েছে সেই রাজা ও রাজার পুত্রকে থামাবেন কেন তিনি? না তার থেকে রেগে অভিমানে মাথা নীচু করে বসে থাকি।
এক রাজা, যে বুঝতেই চাইল না তার ভ্রাতুষ্পুত্র দের অপমান করার জন্য তাদের গৃহলক্ষী কে অপমান করল নিজের পুত্র। সে তো রাজা, তার রাগ হল; কিন্তু রাজধর্মের পালন হলনা। নিজের পুত্রের উপর কি রেগে ফেটে পড়লেন ? না । নীরবে মেনে নিলেন অন্যায়।
এক বীর, যার একটি কথায় অন্যায় বন্ধ হতে পারত সে অন্যায় বন্ধ করল না। মদত দিল অন্যায়ের সংঘটনে। সে অনেক দিন আগে অপমানিত হয়েছিল; তাকে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল এই নারী , সেই রাগের বহি:প্রকাশ হল এক অন্যায়ে। তুই অপমান করেছিস, তাই তোকেও অপমান করলাম । গায়ের জ্বালা মেটালাম।
পঞ্চভ্রাতার কি রাগ হয়েছিল? হয়ত হ্যা। নিজেদের উপর রাগ হয়েছিল । নিজেরাই বিশ্বাস করেছিল রাজকুমার কে। সেই ফাঁদে পা দিয়ে কি হোল? নিজদের আস্তিত্ব তুলে দিতে হল রাজকুমারের হাতে। নিজেরা হল প্রবঞ্চিত, নিজেদের গৃহলক্ষী সর্বসমক্ষে হল অপমানিত। পঞ্চভ্রাতার সেই ক্রোধ কিন্তু বিস্ফোরিত হয়নি সেই ক্ষণে, তবে বিস্ফোরণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল সেই পর্বেই।
আর সেই গৃহলক্ষী,যিনি কারো দুহিতাসম ,কারো নাতবৌ, সমাজের সম্মান! প্রথমে নীরবে দেখল, সে যখন অত্যাচারিত হচ্ছে সেই সময় সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, নিজের একান্ত আপনজনেরা নিশ্চুপ। নত মস্তকে আস্ফালন করছে। কিন্তু কেউ ফেটে পড়ছে না রাগে!সে ভাবল সে কি করবে? স্মরণ করল তার পুরুষাকার কে: সেই পুরুষকার বলে দিল দুটি উপায় আছে:
এক- নিশ্চুপ হয়ে অপেক্ষামান হও রাগে ফেটে পোড়ো না , সময়ের চক্রে যদি স্থান কাল পাত্র পরিবর্তিত হয় এর প্রতিকার দেখতে পাবে হয়ত। তবে নাও দেখতে পারো ;এই পাপীর সাজা! শুধু মনে মনে ইষ্ট কে ডেকে বলে দিলে তার ফল কিন্তু নাও মিলতে পারে । কারণ নিজে উদ্যমী না হয়ে, এই বিচার তুমি নিজে না করে ঈশ্বরের উপর ছেড়ে দিয়েছ! নিজের পুরুষাকার কে নিজেই নিদ্রাভঙ্গ করে জাগ্রত করতে পারোনি!
দুই- অগ্নিসম জ্বলে ওঠো , নিজের আগুন ছড়িয়ে দাও শোকে মুহ্যমান পঞ্চ প্রাণে , সেই আগুন এর স্পর্শ দাও সমাজের সব মনের ভিতর; সর্ব পঞ্চ ভূতে। সেই আগুন এতই তীব্রতর করে তোলো তা বজ্রসম আছড়ে পরুক নিশ্চুপ সমাজে, তোমার অন্তরাগ্নি থেকে অন্যায়কারীর হৃদয়ে এই পাপ বোধের দর্শন ঘটাও , নিশ্চুপ বীরের মানসিক আস্ফালন কে স্তব্ধ করে দাও।
যাজ্ঞসেনী সেদিন চুপ থাকেনি। রাগে ফেটে পড়েছিল। নিজের মনে অগ্নি সংযোগ করেছিল। পঞ্চপ্রদীপের মতন সেই অগ্নিই নিরন্তর প্রজ্বলিত ছিল পঞ্চভূতে, বিস্ফোরণের উদ্দ্যেশ্যে।
সেই অগ্নিতে একটা পচে যাওয়া সমাজের সব পচন, পুঁজ জ্বলে ছারখার হয়েছিল। সেই অগ্নির হাত থেকে কেউ রক্ষা পায়নি। বলশালী ক্ষমতাবান অর্থবান কেউ রেহাই পায়নি, কারণ একদিন রাগে ফেটে না পড়ার যে মহপাপ করেছিল সমাজ - সেই পাপ ছিল ক্ষমাহীণ অপরাধ। আঠারো অক্ষৌহিণী আঠারো দিনে শেষ, সমাজ শেষ ;সব শেষ।
আর সেদিনের নিশ্চুপ বলশালী রা, তারাই ছিল এই অগ্নির প্রথম আহুতি। শেষ সময়ের পূর্বে সকলেই অনুধাবন করে সেদিন রাজসভায় সত্যি রেগে ফেটে পড়তে হত, সেটাই সেই সময়ের দাবি ছিল যেই দাবি কে তারা অগ্রাহ্য করে চুপ ছিলেন। তারা বুঝতে পারেন: যে ব্যক্তি কর্মেন্দ্রিয় গুলিকে সংযত করে মনে মনে ইন্দ্রিয় ভোগ্য বিষয় গুলিকে চিন্তা করতে থাকেন সেই ব্যাক্তিকে অজ্ঞানী মিথ্যাবাদী বলা হয়।
কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে।।
ধীরে ধীরে নিশ্চুপ অবতার রা চির নিশ্চুপ হবার পরেই, অন্তিমেই এসেছে প্রধান অপরাধীর বিচার। আর সেই রাজধর্ম পালনে বিফল রাজা কি করলেন? তিনি রয়ে গেলেন। অনুভব করলেন সেই যাদের উপর অন্যায় হয়েছিল তারাই এখন সর্বেসর্বা, বুঝলেন এটাই সমাজের নিয়ম। আজকের নিপীড়িত কালকের শাসক হবে, সে অন্যায় করবে কারোর উপর, বাদ প্রতিবাদের পরে সেই শাসক পুনরায় হয়ে উঠবে পরশুর ফকির । চক্রাকারে আবর্তিত হবে রাজধর্ম , মানুষ বারে বারেই বিস্মৃত হবে--
"অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে।
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে ।।"
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন