২৬ জুলাই: "জয় বিজয়" : যত বার যুদ্ধে আসবি। তত বার হারবি।।
২৩ বছর হয়ে গেল? এর মধ্যে কত কি হয়ে গেছে তবুও সেই ঘটনা মন থেকে মুছে যায়নি। তখন ১৯৯৯, স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ি।
তখন পর্যন্ত শুনে এসেছি প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে আমদের যুদ্ধ হয়েছিল তিন বার। প্রথম বার ১৯৪৭ এ, স্টেলমেট ও কাশ্মীর সমস্যার সূত্রপাত। ১৯৬৫ সালে লাহোর প্রায় দখলে এসেছিল, তারপরে তাসখন্ড চুক্তি ও লাল বাহাদুর শাস্রীর রহস্যমৃত্যু । পরের যুদ্ধ, ১৯৭১ সালে; এবার জলে, স্থলে অন্তরীক্ষে পাকিস্তান সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়। নৌসেনার বিখ্যাত ত্রাইডেন্ট(ত্রিশূল) আক্রমণে করাচি বন্দর ধ্বংস হয়ে যায়।
৭১ এ ভারতের প্রত্যক্ষ সহায়তায় দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তান এর মনে একদিকে বাংলাদেশ হারবার হাহাকার আরেকদিকে ভারতের প্রতি প্রতিশোধ স্পৃহা বৃদ্ধি; এই নিয়েই সময় এগিয়েছে উপমহাদেশে। শতদ্রু-সিন্ধু-গঙ্গা দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হবার পর এক শীতল যুদ্ধের আবরণে ঢেকে গেছে ভারত পাকিস্তান সম্পর্ক।
সেই শীতল যুদ্ধে দাবানল লেগেছে যখন বুদ্ধ পুনরায় হেসেছে। ভারত বার বার অনুমান করেছে পাকিস্তানের কাছে পরমাণু অস্ত্র সম্ভার এসে গেছে। তাই নিজের আত্মরক্ষার্থে ভারত পোখরানে পরমাণু শক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে বিশ্বকে জ্ঞাত করেছে এই শক্তি ভারত আক্রমণে ব্যবহার করবে না, নিজের উপর পরমাণু আক্রমণ হলে, অর্থাৎ আগে কেউ ব্যবহার করলেই ভারত পরমাণু ব্যবহার করবে আত্মরক্ষার্থে।
আশ্চর্য ভাবে পাকিস্তান তার পরে-পরেই পরমাণু পরীক্ষা করে নিজেদের আস্তিত্ব প্রমাণ করে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে , তার সাথে প্রমাণ করে ভারত এর আনুমান ছিল অভ্রান্ত।
দুই দেশের এই উত্তপ্ত পরিমণ্ডলে দুই দেশের সরকার একটা প্রচেষ্টা করে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার, এই বাতাবরণে যখন ১৯৯৯ সালে ফেব্রুয়ারি তে পুনরায় "লাহোর চুক্তি" পালিত হচ্ছে সাড়ম্বরে তখনো কেউ ভাবেনি সামনে কি দিন আসছে!
পাকিস্তান সেনা সুপরিকল্পিত ভাবে গোপনে তার সেনা-আধাসেনা কে ঢুকিয়ে দেয় কার্গিল অঞ্চলে। কার্গিল কে যুদ্ধক্ষেত্র নির্বাচনের প্রধান কারণ: মুক্ত সামরিক অবস্থানের জমিদখলমূলক যুদ্ধের জন্য আদর্শ স্থান এবং পাকিস্তান সীমান্তের নিকটবর্তী। এক বার পাহাড়ের চূড়া দখল হয়ে গেলে এই স্থান দুর্গ সম কাজ করবে। সামনের প্রান্তরে নীচ থেকেই ভারতীয় বাহিনীকে উঠে আস্তে হবে, কখনো থাকবে উন্মুক্ত ক্ষেত্র, আবার কোথাও চড়াই - উতরাই, আর এলেই ভারতীয় সেনা ঝাঝরা হয়ে যাবে! এই ক্ষেত্র অতিক্র্ম করা অসম্ভব। তাই পাকিস্তান ভাবল দখল হয়ে গেল কার্গিল। নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করা যাবে দ্রাস বাটালিক অংশে, সিয়াচেন কে বিচ্ছিন্ন করে বদলা নেওয়া যাবে বাংলাদেশে উন্মেষের সহায়তার। কিন্তু শেষ হাসি কি পাকিস্তান সত্যি হাসতে পারল? ওরা ভুলে গিয়েছিল ওদের সামনে আসতে চলেছে পৃথিবীর উচ্চ পাহাড় যুদ্ধ বিশারদ এক বাহিনী।
কিছু মাস বাদে, এক পশুপালকের মাধ্যমে আমাদের সেনা বাহিনী যখন খবর পেল তখন শৃঙ্গ দখল করে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শুরু হল এক কঠিন লড়াই। ভারতীয় বাহিনী এক সময়ে মূল্যায়ণ করে অনুধাবন করল; এ এক আত্মহত্যা মূলক প্রতিস্পর্ধায় তাদের অবতীর্ণ হতে হচ্ছে! ১ জন পাক হানাদার কে হারাতে দরকার ১০ টি অমূল্য প্রাণ!
ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রস্তুত হল! রণডঙ্কা বেজে উঠল সারা দেশে। সীমান্তে বীর সন্তান এগোচ্ছে, সারা দেশ তাদের পিছনে সাহস জোগাচ্ছে, প্রার্থনা করছে। আষাঢ়-শ্রাবণ দেশ মেঘের থেকে বেশী শুনল বফর্স কামানের গর্জ্ন। যুদ্ধ শুরু হল প্রবল আক্রোশে।
কিছুদিনের মধ্যে এক এক করে হৃদয় বিদারক খবর, ছবি আসতে থাকল দেশবাসীর সামনে। বীর রক্তস্নাত শহীদের দেহ কফিন বন্দী হয়ে পৌছতে লাগল পরিবারের কাছে; আপন জন চিরতরে বিদায় জানাল ঘরের ছেলেকে।
বাবা চেতনা শূণ্য হয়ে চেয়ে রইল ,
মা শোকে নিথর হয়ে জ্ঞান হারাল;
ভাই- বোন দেখল তাদের ভাই আর তাদের সাথে কথা বলছে না , খুনসুটি করছে না।
বন্ধু দেখল, তার একটা সময় সারণী হারিয়ে গেল জীবন থেকে।
প্রেয়সী দেখল দুই জনের পথ চলার অঙ্গীকর থেকে তার কাছের মানুষ আজ মুক্ত, সেই পথে তাকে চলতে হবে একা, সাথে থাকবে শুধু স্মৃতি। স্ত্রী দেখল যে মানুষটা কে সে চিনেছিল, সেই মানুষটা কোথায় চলে গেছে, যাবার আগে বলে যায়নি যে চিরতরে চলে গেছে; সে অপেক্ষা করে থাকবে, কিন্তু মানুষ টা আর ঘরে ফিরবে না। পুত্র-কন্যা দেখল বাবা উঠছে না, অনেক ডাকলেও চোখ খুলছে না; বাবা আর কোনোদিন খেলবে না; কষ্ট পেলে বুকে টেনে বলবে না কোনো ভয় নেইরে; দৌড়ে এসে আদর করবে না আর!
আর সারাদেশ ? এই ছবি গুলো দেখল, ভাবল, কাঁদল, চোয়াল শক্ত করে উঠে দাড়াল হাতে হাত রেখে। সেদিন সারা বিশ্ব দেখল ভারতের সব হিন্দু, শিখ, মুসলমান, পারসিক , বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, নাস্তিক, অস্তিক, সব রাজনৈতিক দল, সব মানুষ এক মন্ত্রে জেগে উঠেছে, সারা দেশ হয়ে উঠল এক পরিবার। বিশ্বের সব থেকে বড় গনতন্ত্র নিজের বিভেদের মধ্যে ঐক্যের সব থেকে বড় প্রমাণ দিল এই কঠিন সময়ে।
আরেক দলও কিন্তু দেখল, তারা নিজের সহযোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানাবার সময় টুকুও পেলনা, শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিল: যে হানাদার দের জন্য পাশের সৈনিকবন্ধু চলে গেল ঐ হানাদারদের উড়িয়ে দিতে হবে ,সরিয়ে দিতেই হবে যে কোনো মূল্যে। শুরু হল ভয়ানক প্রতিআক্রমণ ।এক এক করে উচ্চ হিমালয় গিরিশিখর মাথা নত করল ভারতীয় সেনার প্রবল পরাক্রমের সামনে।
ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা "দিল মঙ্গে মোর" বলে পিক ৫১৪০ জয় করে এগিয়ে গেল পিক ৪৮৭৫ জয় করতে, নিজের দলের এক সহ সৈনিককে বাঁচাতে গিয়ে শহিদ হল , রেখে গেল সারা দেশের যুব সম্প্রদায়ের কাছে এক অমোঘ বার্তা: যুদ্ধে যখন যাচ্ছি , ফিরে তো আসবই । পতাকা উড়িয়ে অথবা পতাকায় ঢেকে"।
গ্রেনেডিয়ার যোগেন্দ্র সিং যাদব এগিয়ে গেল টাইগার হিলের ১৬৫০০ ফুট উঁচু চড়াইএ। একা, দড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে শত্রু বাঙ্কার থেকে একাধিক অঙ্গে গুলিবদ্ধ হল; কিন্তু ভ্রূক্ষেপ না করে দু খানা শত্রু পূর্ণ বাঙ্কার একা গুড়িয়ে দিল। এর ফলে নীচের সেনারা সহজে উপরে উঠে এল, টাইগার হিলের দখলের পথ খুলে গেল। যোগেন্দ্র সিং বলে গেল : এক জন সৈন্য হল যে আত্মভালোবাসা জানেনা, সে জানে সে দেশের জন্য বলি প্রদত্ত, নিজের পল্টনের জ্ন্য আত্মত্যাগে বদ্ধ পরিকর।
এরকম, এক এক অনন্য নজির সৃষ্টি করল এক এক যুদ্ধ নায়ক। লেফটেন্যান্ট মনোজ কুমার পাণ্ডে, লেফটেন্যান্ট বলওয়ান সিং, মেজর রাজেশ সিং আধিকারি এবং আরো অনেক অনেক বীর সেনার অকুতোভয় আক্রমণে আমরা ২৬ এ জুলাই ১৯৯৯ সব পাকিস্তানী সেনা কে বিতাড়িত করে বা শমনে পাঠিয়ে নিজেদের ভূমি পুনরুদ্ধার করলাম,
সেনাবাহিনী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল গিরি শিখরে ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ।
পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করল ভারতীয় সেনাবাহিনী।
সারা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিল প্রবল ক্ষমতা শুধু অর্জন করলেই হয়না, সেই ক্ষমতা কে সঠিক পরিমিতিবোধের মাধ্যমে ব্যবহার করতে হয় , ভারত আক্রান্ত হয়েও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত ছিল।
এই যুদ্ধের পরে ভারতীয় বাহিনী সারা পৃথিবীতে প্রথম শ্রেনীর উচ্চকোটি বাহিনীর মধ্যে পরিগণিত হল, পরিচয় পেল।
প্রতিদিনের মতোই কাল দিন শুরু হবে, তবে দিন প্রবাহিত হবে একটু অন্যভাবে। দেশের প্রতিটি মানুষ বিনম্র চিত্তে, শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে
৫৩০ জন শহিদ কে, ১৩০০ জন আহত বীরকে। ২৩ বছর আগে বীর ভারত সৈন্য মাতৃভূমিকে রক্ষা করেছিল। আজকে আমাদের " কার্গিল বিজয় দিবস" । পাকিস্তান ৪ বার এসেছে আক্রমণ করতে, ৪ বারই হেরেছে। "জয় বিজয়"।।
তবু বলব আসিস না আর যুদ্ধ করতে, তোদেরও ক্ষতি আমদেরও ক্ষতি। যুদ্ধে দুই দেশই শুধু সন্তান হারায়, সেই মূল্য খুব বেদনাদায়ক। যুদ্ধের আর্থিক মূল্য চোকাতে দুই দেশের ভাণ্ডারেই টান পরে । তাই আক্রমণ করিস না। ভারত যুগযুগ ধরে কোনো দেশ কে আক্রমণ করেনি, করবেও না। তবে আমাদের কেউ আক্রমণ করলে শেষ করে দেব তাদের। ভেবে দেখ আমাদের সৈন্যদের শেষ পঞ্চাশ ষাট বছরে ৪ থেকে ৫ টা বড় বড় যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে, সাথে কি ভাবে জিততে হয় সেটাও জানি। সুতরাং সাবধান, তবুও যদি আবার নির্লজ্জের মতন আসিস তাহলে:
যত বার যুদ্ধে আসবি।
তত বার হারবি।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন