কর্মবীর ফেলে দীর্ঘশ্বাস । পরকর্মে সর্ব সুখ আমার বিশ্বাস।।
"কিরে দীপ ! আজকে সকাল সকাল হঠাৎ এদিকে এলি, বেরোবি না আজকে? ছুটি নিয়েছিস নাকি!" - দীপ কে সকাল বেলা চায়ের দোকানের সামনে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল অভি। কাজের দিনে সকাল সকাল চায়ের দোকানে দীপ এসেছে, এটা সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না অভির! অভির দুদিকে বসে থাকা রাহুল, মলয় ওরা দুজনেও অবাক হয়ে গেছে দীপকে ওদের আড্ডায় উপস্থিত দেখে।
অভি, দীপ, রাহুল , মলয় -ওরা চার বন্ধু ছোট বেলা থেকেই এক পাড়ায় আছে। এক স্কুলে এক শ্রেণীতে পড়ত, পরবর্তীকালে প্রত্যেকেই ভিন্নভাবে ভিন্ন বিষয়ে স্নাতক হেয়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হলেও ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব এখনো অটুট। অভি এখন পুলিশ বিভাগে আছে, দীপ সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার , রাহুল বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত, মলয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের আধিকারিক। প্রত্যেকেই গার্হস্থ্য পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, তবুও ছোট বেলার একটা অভ্যাস কেউ ত্যাগ করেনি : সকাল সকাল দেখা করা।
আগে স্কুল লাইফে সকাল বেলায় চারজন খেলতে যেতো মাঠে। গ্রীষ্মকালে সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে বল নিয়ে মাঠে দাপাত, শীতকালে ছটা সাড়ে ছটার দিকে ক্রিকেট খেলতে শুরু করত। আরেকটু বড় হতে হতে সকালে সকলে সাইকেল নিয়ে ঘুরত। তবে এখন অভি ছাড়া কারোরই খেলাধূলা বা শরীর চর্চায় আর সেই উৎসাহ নেই। এখন সকালের ছোটি-সি-মুলাকাত হয় পাড়ার তিন রাস্তার মোড়ে হরি দার চায়ের দোকানে।
তবে সবাই সব দিন সকালে আসতে পারেনা, কিন্তু চেষ্টা করে। এই কয়েক বছর ধরে অভি দেখেছে দীপ শুধু রবিবার আড্ডায় আসে, বাকি দিন হসপিটাল সেরে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায় ছেলেটার , তাই কাজের দিনে সকালের চা এর আড্ডায় দ্বীপ ডুমুরের ফুল। সেই ছেলেই হঠাৎ মাঝ সপ্তাহে সকাল সাড়ে সাতটার সময়ে চায়ের দোকানে এসেছে!
দীপ হেসে বলল: আরে সেরকম কিছু না রে ভাই। তোদের সাথে দেখা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আর এই সকাল সকাল জানি সব মক্কেল হরি দার দোকানেই জুটবি; তাই চলে এলাম। পাশের থেকে রাহুল বলল : তা একটা ফোন করে তো আসতে পারতিস, যদি আমরা আজকে না আসতাম, বা চা পর্ব সেরে বেড়িয়ে পরতাম! দীপ সাথে সাথে রাহুল কে বলল : ওরে আমার কোথাকার ভিআইপি এলেন। ছোটবেলার পাড়ার বন্ধু দের সাথে কথা বলতে আসব আবার ফোন করে অ্যাপো নিয়ে আসতে হবে নাকি!
তবে , আসতে আসতে অবশ্য ভাবছিলাম সব কটা চা খেয়ে কেটে পরেছিস হয়তো। তা রাহুল তুই আজকে অফিস যাবিনা? অভি, মলয় তোদের ডিউটি কি অফ আজকে?
রাহুল বলল: না আমি আজকে বাড়ির থেকেই কাজ করব। কাল সারা রাত ল্যাপটপ খুলে কাজ করতে হয়েছে , তাই আজ বাড়ির থেকেই সামলাব।
অভি বলল : আমার আজকে দুপুরের ডিউটি।
মলয় উদাস ভাবে বলল: তোদের কি মজা! একজন বাড়ি থেকে করবি, এক জন রাজার মতন দুপুর বেলায় থানায় যাবি, আর আমাকে সকাল ১০ টার ভিতর ঢুকতেই হবে ব্যাঙ্কে, সময়ের মধ্যে না ঢুকলে লাল কালিতে লালায়িত করে দেবে! আর ডাক্তার বাবু আপনি তো আজ ডুব দিচ্ছেন মনে হয়। সবাই বেশ মজায় আছে , জ্বালা শুধু আমাদের মতন নিয়মের গেরোয় আটকে থাকা কর্মীদের। পান থেকে চূন খসলেই হয়ে গেল, আর্থিক বেনিয়মের অভিযোগ!
মলয়ের শীতল বাণী শুনে, ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে হাতের পেশী ফুলিয়ে প্রায় মারতে যায় অভি।রাগে রক্তিম হয়ে বলে : মলয়, সকাল সকাল শুরু করলি তো নাকিকান্না ! আমার দুপুর দুপুর থানায় যাওয়া দেখলি। সারা রাত যে থানায় বসে ডিউটি করেছি সেটা কিছু না? তুই ব্যাটা সকাল ১০ টায় ঢুকে বিকাল পাঁচটা সাড়ে পাঁচটায় বাড়ি ফিরিস, বউ বাচ্চা কে সময় দিতে পারিস। আমি তো এমন দিনও যায় থানায় যাই আবার দুদিন থেকে দুসপ্তাহ পরিবার বলে কিছু আছে সেটাই ভূলে যাই।
তোদের সবার ছুটি থাকে। আমার ছুটি থাকে কোনো? যখন খুশী ডাক পরে থানায় এসো। রাহুলও তো শনি, রবি লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে পরে । প্রতি তিন চার মাসে একটা করে ট্রিপ করে। আমি সেই দেড়-দুই বছরে একটা ট্রিপ করতে পারলেও বর্তে যাই।
দীপও অন্তত একদিন ছুটি পায় সপ্তাহে, সরকারি ছুটি গুলোও তো পায়। পুজোর সময়ে ঘুরতে পারে। আর আমি পুজোটা কাটাই রাস্তায়। বলেই রাগে ফেটে পড়ল অভি।
রাহুল কম্পিউটার মাউস নিষ্পেষিত তর্জ্নী উত্থিত করে বলে ওঠে: একদম বাজে কথা বলবি না অভি; তোর থানা থেকে ডাক এলে তুই একটু সময় তো পাশ মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে, দশটা চার অক্ষর তো উপরমহল কে অন্তত বলার সময় পাস! আর ওদিকে আমার অফিস তো আমার পিঠে কাকের মতন বসে থাকে। ল্যাপটপ আছে, সুতরাং গভীর রাতে ঘুমের মধ্যে টেনে তুলেই বিদেশী খিস্তি শুনতে শুনতে চোখ কচলে জলদি জলদি সমস্যার সমাধান করতে হয়।
বাড়ির থেকে কাজ করা তোদের কাছে মজার , কিন্তু আমাদের এটা অনেক অনেক সময় সমস্যার। অনেক সময়েই, সাত দিন × ২৪ ঘন্টা হয়ে যায়।তোরা তো বলেই বেড়াস, আমাদের কায়িক শ্রম নেই, এসি তে বসে থাকি। তাই তোদের মনে হয় আমাদের একটুও কষ্ট নেই। হ্যা কায়িক শ্রম নেই একদম ঠিক, কিন্তু ডেলিভারির তাড়নায় মানসিক শ্রমে প্রতি মুহূর্তে মাথা টাকে সচল রাখতে হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে মানসিক চাপ ডেডলাইন মিস হবে না তো! অনেক সময়তো শনি-রবি বার একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে ক্লাইম্যাক্স টাইমে হলের মধ্যে ফোন আসে : চলো বসি,কিছু করে দেখাই। রাস্তায় মাঠে ঘাটে বসে সমস্যার তৎখনাৎ সমাধান করতে বসতে হয়। আমদের অফিস আমাদের থেকে অলিখিত মুচলেকা নিয়ে নিয়েছে: রণে বনে জলে জঙ্গলে যখনই বিপদে পড়বে আমাকে স্মরণ করিবে, আমি কোড করিতে বসিব।।
তোরা বাইরে বেড়াতে গেলে অন্তত শান্তিতে প্রকৃতি দেখতে পারিস, আমার ল্যাপটপ না থাকলে ফোনে ফোনে বেদের যুগে ফিরে যাই। শ্রুতি নাটকের মতন কিভাবে সমস্যার সমাধান হয় বলতো? - মাথায় মাথায় আর মুখে মুখে। এই বলে রাহুল এবার চুপ হলো।
এই সব শুনে দীপ খুব বিস্মিত। একবার তিনজনের মুখের দিকে তাকায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে: বাপরে বাপ এতো অভিযোগের পাহাড়! দাড়া ভাই, এক এক করে আসছি। আগে চা দিয়ে মেজাজ টা তো চাঙ্গা করি।
যাই হোক আগে বল তোদের কি চা নেওয়া হয়ে গেছে ? তোদেরও চা দিতে বলি?
অভি , রাহুল, মলয় তিনজনেই মাথা নেড়ে চায়ের জন্য সম্মতি জানালো। "ওও হরি দা চারটে স্পেশাল চা দাওতো"।
হরি দা ওদের দিকে তাকিয়ে একবার মিটিমিটি হাসতে থাকে। হরি দা, জানে এই চারজন এইবার যুক্তি তর্ক চেঁচামেচি করে দোকান মাথায় তুলবে। সেই ছোট বেলা থেকে দেখছে, এত্ত বড় হয়ে গেল এদের চেঁচানো থামল না। হরি দা হেসে বলল: দিচ্ছি গো চা দিচ্ছি, দাড়াও, একটু সবুর করো। তোমরা বেঞ্চে বসে গল্প করো।
ওদের বাবারাও হরি কে দাদা বলেই ডাকে, এরাও তাইই বলে। এই পাড়ার সবাইর কাছেই বছর সাতান্নর চা দোকানের হরি এখন হরি দা হয়ে গেছে, ভালোই লাগে হরি দার শুনতে।
হরি দা চা দেওয়ার সম্মতি জানাতেই দীপ তিন বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলল:
তোদের একটা কথা বলি ভাই। দেখ রাহুল, অভি, মলয়; একবার ভেবে দেখতো হাসপাতালে আমার সত্যি ডিউটি সময় জ্ঞান বলে কিছু আছে? যখন
রোগীর মুমূর্ষু অব্স্থা চলছে সেই সময় কি আমি বেরিয়ে আসতে পারব? না পারব না। আমার বাকি সব কিছু একদিকে সরিয়ে, ঐ রোগীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে যা যা করবার; যতক্ষণ সময় দেবার দেবো। সেই সময়ে আমার বাড়িতে কিছু দুর্ঘটনা ঘটল কিংবা পৃথিবী রসাতলে গেল আমি সেইসব নিয়ে ভাবতেই পারব না! ভেবে দেখতো এই ভাবে বিশ্ব সম্পর্করহিত হয়ে তোরা কতক্ষণ থাকিস? আর বাকি দিন-রাত কোথা দিয়ে বয়ে যায় টেরও পাইনা।
মলয়, তুই ব্যাঙ্কে যদি অনিচ্ছা কৃত ভূল করিস তোর ভূলের মাপকাঠি অর্থ; অভি, তোর পুলিশি ভূলের মাশুল প্রশাসনিক ব্যর্থতা; রাহুলের তথ্যপ্রযুক্তি কোডের ভূলের দায় প্রযুক্তিগত যান্ত্রিক ত্রুটি। তোদের সবার ভূলের যে প্রভাব সেটা অনেক ক্ষেত্রেই মারাত্মক। তবে চেষ্টা করলে সেটা হয়তো পরবর্তীতে সংশোধনের সুযোগ আছে।কিন্তু আমি যদি ভূল করি? একটা প্রাণ, অথবা একটা অঙ্গহানি ঘটে যায় ভূলবশত। সেই ভূলের সংশোধন কি আদৌ সম্ভব?
"ওরে বাবা তোদের তো বেশ লড়াই হচ্ছেরে নিজেদের পেশা নিয়ে। ভালো ভালো সকাল সকাল লড়াই করলে বেশ নার্ভ গুলো সচল হয়ে ওঠে, কি বলো হরি দা,হা হা হা।"- চারমূর্তি দেখল সামনের বেঞ্চ থেকে চা খেতে খেতে মুখের সামনে থেকে কাগজ সরিয়ে বেরিয়ে এলেন অধ্যাপক নির্মল সেন, ওদের সবার নির্মল কাকু।
"আরে নির্মল কাকু, তুমি! কবে এলে? অনেকদিন পরে দেখছি তোমাকে। কেমন আছ?" :চার বন্ধু একত্রে বলে উঠল। ওরা সবাই নির্মল কাকু কে দেখে যুগপৎ বিস্মিত আর পুলকিত।
কাকু দিল্লী তে বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন, পদার্থ বিদ্যার উপর গবেষণাও করেছেন। কাকুর অনেক বিষয়ে অগাধ জ্ঞান, অসীম পড়াশুনা। ছোটবেলা থেকে নির্মল কাকু ওদের অনেক নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞাত করেছে, ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে । ওরা বলতে গেলে নির্মল কাকুকে সামনে রেখে রোলমডেল করেই এগিয়ে গেছে নিজের নিজের মতন করে । কাকু ওদের সাথে বন্ধুর মতন মেশেন। সেই কাকু কে হঠাৎ সকাল সকাল হরি দার চায়ের দোকানে দেখতে পাচ্ছে, বেশ ভালো লাগছে ওদের।
নির্মল কাকু হেসে বলল: হা হা, আমি ভালো আছি। কাল রাতেই এসেছি।এই কিছু কাজ আছেরে , দিন পাঁচেক আছি কলকাতায়। সেই পুরনো অভ্যাস মতন সকাল বেলা হরিদার দোকানে এসেছি। চা সহযোগে খবরের কাগজ পড়ছিলাম, তারপর কাগজের আড়ালে তোদের আলোচনা শুনছিলাম । বাবা সব বিশাল বড় হয়ে গেছিস তো। তা এত আলোড়ন হচ্ছিল কেন?
অভি উত্তর দিল কাকু, আপনিই বলুনতো আমি যা বলেছি তা কি ভূল?
অভির কথা শেষ হতে না হতেই বাকিরাও চিত্কার করে উঠল , কে ভূল বলেছে তাহলে?
কাকু কাগজ টা পাশের বেঞ্চিতে রেখে চাএর ভাঁড় টা ডাস্টবিনে ফেলে দুই হাত বিস্তৃত করে ওদের মাঝে উঠে দাড়িয়ে বলে উঠল : শান্তি, শান্তি। বড় হয়েছিস, এখনো বাচ্চাদের মতন করছিস!
তারপর হরি দা কে উদ্দেশ্য করে বলল : হরি দা, আরেক কাপ চা হয়ে যাক। ততক্ষণ আমার ব্যাটেলিয়ন কে একটু মগজ ধোলাই দেই।
বলেই নির্মল কাকু ধীরে ধীরে চার জন কেই উদ্দেশ্য করে বলল: দেখ সত্যি কথা বলতে গেলে প্রত্যেকের পেশাতেই ব্যতিক্রম আছে, স্বতন্ত্র সুযোগ - সুবিধা - অসুবিধা - অভাব- অভিযোগ আছে। এক এক করে সবার বিষয়েই বলছি।
মলয় যেমন নিয়মের ঘেরাটোপে আবদ্ধ। ও প্রতিটি অর্থের হিসেব দিতে সদা সাবধানী, ভূলচুক হলেই কারাগারে এক পা বাড়িয়ে থাকবে । নিয়ম এর বেড়াজাল ওকে সদা তটস্থ করে রেখেছে। তবুও সারাদিন ভিন্নজনকে ভিন্ন ভাবে সাহায্য করছে কি ভাবে তারা তাদের অর্থকে সুরক্ষিত করে, তার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভালো মূল্য পাবে। সারাদিন অন্যের জন্য শুভংকরী ধাঁধার হিসেবেই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। তবে ওর অন্যদিকে একটা সুবিধাও হয়ত আছে। নিজের পরিবারে কখনো আর্থিক ঋণের প্রয়োজন হলে অনেক সহজেই অর্থের সংকুলান করে ফেলবে।
এইবার আসি অভির ব্যাপারে। অভি যেমন একদিকে পারিবারিক সময় পায়না কিন্তু পরিবার কে নিয়ে কোথাও বেরোলে ওর ইউনিফর্ম বা পুলিশ চিহ্ন একটু হলেও সম্ভ্রম বোধ জাগ্রত করে আশেপাশের মানুষের মধ্যে। ওদের পেশায় আড়ালে আবডালে ওদের বিরুদ্ধে গুচ্ছ গুচ্ছ মানহানিকর কথা অনেকেই বলে। কিন্তু কোনো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির উদ্রেক হলে এরাই প্রথমে স্থিতধ্বী হয়ে, সব কটূক্তি কে উপেক্ষা করে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে যায়। সাধারণের অগম্য স্থানে ওরা যেমন সহজে গমন করতে পারে সেই ভাবে দুষ্কৃতীর সাথে মোকাবিলায় শমনের শঙ্কার ডঙ্কাও শুনতে পায়।
আচ্ছা চল রাহুল কে দেখে নেই; ও একদিকে যেমন মাঝে মাঝে হয়ত বিদেশ ভ্রমণ এর সুযোগ পায়, কিছু কিছু সময়ে আর্থিক ভাবে হয়তো একটু হলেও উন্নততর সচ্ছ্বল অব্স্থায় থাকে।
ওদের তথ্য প্রযুক্তি মারফত যে পরিমাণ কর সরকার লাভ করে বা ভারতীয় সংস্থারা লাভ করে তা দেশের অর্থনীতি তে এক বিশাল যোগদান। কিন্তু ভেবে দেখ চাকরী শেষে ওদের কিন্তু পেনশন নামক সুরক্ষা নেই বার্ধক্য কালে। ওদের কাজের ধরন ওদের মানসিক চাপ ওদের শরীরে প্রভাব ফেলে , তার সাথে সাথে প্রতি নিয়ত ঘাড়ের কাছে একটা ছাঁটাইয়ের খাঁড়া ঝুলতে দেখে, অনেকটা খুড়োর কলের মতন ;খাঁড়ার কল । সুকুমার রায়ের খুড়োর কল ঝুলছে সামনের দিকে কিন্তু এই খাঁড়ার কল ঝুলতে থাকে রাহুলের মাথার উপর।
আর সবশেষে দীপ, যদি কোনো রোগী কে বাঁচিয়ে দেয় তখন ও ভগবান। আবার সেই ভগবান যদি রোগী দেখার অর্থ নেয় তখন হয়ে যায় কসাই।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি আচ্ছা যে লোকটা ডাক্তার কে ভগবান বলছে সে বাড়িতে ভগবানের পূজো কি বিনা পয়সায় করে ? সে কি ফুল, ফল, ভোগ, পুরোহিতের জন্য কিছু খরচ না করেই বলে- "ভগবান তুমি খুশী হয়ে যাও! আমাকে খুশী করে দাও!"
হাতের সামনে ডাক্তার জ্যান্ত ভগবান হয়ে ঘুরছে , কিন্তু ওদের নৈবিদ্য দিলেই ডাক্তার হয়ে যায় ডাকাত, অর্থ পিশাচ ।
আবার কখনো হাজার চেষ্টার পরেও দীপের মতন কারোর হাতে যদি কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটে তখন অনেকের চোখে ভগবান থেকে শয়তান হয়ে যায়। এর পর নির্দ্বিধায় ওদের নিগ্রহ করার লাইসেন্স পেয়ে যায় কিছু উত্কেন্দ্রিক মানুষ।
এত কিছু বলে নির্মল কাকু একটু, থামলেন। তাকিয়ে দেখলেন তার চার সঙ্গী স্থিরহয়ে তাকে দেখছে, চোখে এক উজ্জ্বল দীপ্তি। কাকু এবার জিজ্ঞেস করলেন ,কিরে নিজদের কি চিনতে পারলি নিজদের কর্মজ্গৎ এর দর্পণে। প্রত্যেকেই দেখলাম নিজের নিজের কর্মের পীড়া, দু:খ উগড়ে দিচ্ছিস। ভালো, বন্ধু দের সামনেই তো বলবি। আর এই সব বের করে দিলে শান্তিও পাবি।
নির্মল কাকুর কথার রেশ ধরেই মলয় স্নিগ্ধ হেসে বলে উঠল: সত্যি কাকু, শান্তি পেলাম। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেক কে কেমন বিনাদোষে দোষী বানিয়ে ফেলেছি অবচেতনে। "ও ভালো আছে, আর আমি ভালো নেই" সবার কথার নির্যাস এটাই হয়ে উঠেছিল কাকু। কিন্তু এখন বুঝতে পারলাম প্রত্যেকের একট নিজের নিজের হিসাবের খাতা আছে। সেই খাতা উপেক্ষা করে অন্যের খাতা দেখে আমরা নিজেদের বিচার করেছি এতদিন। আজ সেই ভূল ভেঙ্গে গেল, আজ থেকে নিজের কাজের দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ সেইসব ই বিচার্য হবে, অন্যের দর্পণে নিজেকে আর দেখবই না। মলয়ের কথা শুনে বাকি তিন বন্ধুও বলে উঠল ঠিক বলেছিস, এটাই সঠিক মূল্যায়ণ ।
কাকু তৃপ্তির হাসি হেসে উঠল । সাথে সাথে হরি দা পাঁচ কাপ স্পেশাল চা দিয়ে গেল।
চা এর ভাঁড় নিয়েই অভি, গম্ভীর ভাবে দীপ কে ডেকে বলল: শোন ভাই যদি তোকে কোনোদিন কেউ হসপিটালে পিটাতে আসে , আমাকে একটা ফোন করবি। তারপর দেখ আমি গিয়ে ওদের কি হাল বানাই।
দীপ হাসতে হাসতে বলল, আগে মার খেয়ে তারপর ফোন করব নাকি মার খাওয়ার আগে ফোন করব?
অভি ভুরুকুঁচকে বলল: মানে টা কি?
দীপ একটু তফাতে গিয়ে বলল: গামবাট তুই গামবাটই থেকে গেলিরে! পুলিশ প্রমাণ ছাড়া পদক্ষেপ কি ভাবে নেবে? বলেই এক ছুট দিল!
অভি দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল : এই জন্যেই তোকে পিটানো উচিৎ।
পেছন থেকে মলয়, রাহুল, নির্মল কাকু হো হো করে হেসে উঠল।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন