মাস্টারমশাই , আপনি কিন্তু কিছু শোনেননি।।

"কিগো কালকে কি পরিকল্পনা করছো?  কোথাও বেড়াতে যাবে নাকি ? প্রতি সপ্তাহেই তোমাদের ফেসবুক প্রোফাইল তো নতুন নতুন বেড়ানোর ছবিতে ভর্তি হয়ে থাকে। সত্যি তারিফ করতে হয় তোমাদের পছন্দের ,কাছাকাছি বা দূরে যেথানেই যাও যায়গা গুলো চোখ আর মন দুইই জুড়িয়ে দেয়। আমি তো আমার কর্তাকেও দেখাই, বেশ ভালো লাগে আমাদের"। - পাশের সিটে জানালার দিকে বসা সহযাত্রী সোমা কে উদ্দেশ্য করে বলল রিয়া। সোমা ভুরুকুঁচকে বলল : ধন্যবাদ রিয়া দি, তবে সপ্তাহের মাঝে কাজের দিনে হঠাৎ বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা কি ভাবে করি বলোতো! কালকে তো স্কুল আছে।
রিয়া একটু বাঁকা হেসে বলল "ও মা কালকে তোমাদের ছুটি নেই! আজকাল স্কুলে তো শুনি পূর্ণিমার দিনও ছুটি দেয়" বলেই এক বিদ্রূপের হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই কথা শুনে আশেপাশের নিত্যযাত্রীরাও মুখ টিপে হাসছে। দু একজন টিপ্পনীও কাটলো: স্কুলের চাকরির মতন চাকরি হয় নাকি? ওদের তো বারো মাসে তেরো পার্বণের মতন ছুটিই থাকে!কোভিড কালে তো বসে বসেই মাইনে পেল এরা"।
সাথে সাথেই রিয়া বলল : যা বলেছেন , বুঝিনা এদের এত ছুটি দেয় কেন? এদের থেকে বেশী কাজ করে-করেও আমাদের ছুটির দেখা নাই রে ছুটির দেখা নাই। আর এরা দুপা তুলে ঘরে বসে থাকে।

সোমা কথাগুলো শুনল, কিন্তু প্রত্যুত্তর করল না। ওর শিক্ষকতার পেশা নিয়ে এইভাবে একটা রগরগে মজা করা দৈনন্দিন রুটিনের মতন হয়ে গেছে সহযাত্রী দের। এদের বার বার বুঝিয়েও লাভ হয়নি ,আগে জবাব দিতো,  উত্তেজিত হতো। পরে ও ব্যাপারটা অনুধাবন করল আসলে ওকে উস্কে দিয়ে বাকি রাস্তাটা সহযাত্রীরা সব মজা নিতে নিতে যায়, এখন নিজেই উপলব্ধি করেছে মৌনতাই এইসব গাত্রদাহ পূর্ণ কথার সব থেকে ভালো উত্তর।
তাই চুপচাপ বসে জানলা দিয়ে দেখতে লাগল সবুজ গাছগুলো পিছনে চলে যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ একি!! এক প্রৌড়ার বিসদৃশ মন্তব্য কানে এল সোমার।

"এই যে মায়েরা, মেয়েরা কি নিয়ে হাসাহাসি করছো  তোমরা? ঐ মেয়েকে যা যা বললে সেটার কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ করছি আমি। " বলেই তিনি গম্ভীর ভাবে সবার দিকে তাকালেন। সোমা দেখল এক সাদা শাড়ি পরিহিতা বয়স্কা মহিলা এই কথাটা বললেন। মুখে চোখে জ্ঞানের স্নিগ্ধ স্পর্শ বিরাজমান।
রিয়া সাথে সাথেই বলে উঠল :  মাসীমা আপনিতো একদম দুর্বাসার মতন ভষ্মই করে দেবেন মনে হচ্ছে!  আমি কি ভূল টা বলেছি একটু বুঝিয়ে দেবেন? - বলেই একট তাচ্ছিল্য মিশ্রিত হাসি ছুড়ে দিল রিয়া। ট্রেনের কামরায় বাকিরাও আবার এক বিষয় পেল মনোনিবেশ এর। সবাই তাকিয়ে রইল মাসীমার দিকে, মনে মনে ভাবছে যাক সময়টা ভালোই কাটবে তাহলে!
মাসীমা উত্তর দিল :  এক এক করে সব কটা বিষয়েই আসছি । আগে ছুটির প্রসঙ্গে আসি মা।
এই যে একটু আগে তুমি বললে, অফিসে এত কাজ করে বাড়ি ফেরো, অনেক খাটনি হয় তোমার। ছুটির পরিমাণ কম বলে মনে হয়। তা, সেইগুলো কি হঠাৎ নতুন করে শুরু হয়েছে? মানে তুমি নিশ্চয়ই যেদিন তোমার কর্মক্ষেত্রে যোগদিয়েছিলে সেদিন নিশ্চয়ই জেনেই যোগদিয়েছিলে এইরকম একটি জীবনধারা তোমার হতে চলেছে। আজকে কেন তুমি অন্য এক পেশার সাথে নিজের পেশার তুলনা করছ ? তুমি কি জ্ঞাত আছ, এক শিক্ষকের নিযুক্তিপত্রে কি লেখা ছিল?  মনে হচ্ছে না জেনেই অর্বাচীন এর মতন মন্তব্য করে দিলে। এরকম অবিবেচক এর মতন মন্তব্য কেন করলে মা?

মাসীমার কথা শুনে রিয়া হঠাৎ বেশ থতমত খেয়ে গেছে! এই ভাবে এক যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা হবে ওর কল্পনাতেও ছিলনা। আমতা আমতা করে বলল : না মানে দেখি তো ওদের ছুটি অনেক বেশী , তাই বললাম। 
মাসীমা কথাটা শুনে আরো অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। অনুনাদ এর স্বরে বললেন: নির্বোধের মতন কথা বোলোনা মা। এক জন মানুষ টানা ৬ থেকে ৭ ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে নিজের স্বর কে সপ্তমে নিয়ে ভবিষ্যতকে তৈরী করে দেয় , কি অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করে নিজের বৌদ্ধিক মতকে বজায় রেখে সহজ সরল প্রাঞ্জলভাবে তোমার আমার বাচ্চা দের শেখায়! ভবিষ্যত সমাজের মেরুদণ্ডটা তৈরী  করে দেয়। তাদের এই কষ্টটা কখনো অনুধাবন করেছো?
তোমার উপরতলার সভ্যগণ যেমন তোমার কর্ম অনুসারে ছুটি নির্ধারণ করে অন্য সব পেশাতেও তো একই নিয়ম। তাহলে তুমি যেমন নিজের ছুটি বাড়াতে বা কমাতে পারো না তুমি কিভাবে ভাবলে শিক্ষকরা সেটা পারবে? যেখানে ওদের হাত দেওয়ার পরিধি নেই সেই খানে তুমি ওদের দোষ দিচ্ছ, উপহাসের পাত্র করছ ! সত্যি এ এক বিচিত্র মানসিকতা!
আর, এই যে বাকি যারা আছ তাদের বলছি: কোভিড কালে শিক্ষকদের মাহিনা নেওয়া টাই দেখলে তোমরা! এরা কিন্তু ঐ ভয়ংকর সময়েও সরকারের ডাকে ভোট করাতে ঘর থেকে বেড়িয়েছে , মরেছে!  আবার স্কুলের বাচ্চাদের খাবারও পৌছে দিয়েছে। এই গুলো একবারও তোমাদের মনে পড়ল না! শুধু মনে এলো ঘরে বসে থাকার কথাটা? ঘরে বসে এরা প্রচেষ্টা করেছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষাচক্র কে প্রযুক্তি মারফত ছড়িয়ে দিতে, হয়ত অনেক ক্ষেত্রেই সেই ব্যবস্থা ফলপ্রসূ হয়নি অপ্রতুল পরিকাঠামোর জন্য। তবুও তোমরা এদের কথা শুনিয়ে যাচ্ছ! সত্যি কি এদের চেষ্টায় খামতি ছিল? ভেবে দেখো। না জেনে আমরা অনেক অনেক কথা বলে দেই কিন্তু সেই কথার পিছনে কি সত্যি কোনো যুক্তি বিদ্যমান? অন্যকে হেয় করে এইভাবে উল্লাসের কি কারণ?

মহিলা কামরার অন্যদিনের কোলাহল নিমিষে যেন হারিয়ে গেছে। সবাই প্রায় আমতা আমতা করছে, কিন্তু কেউ মাসীমার দীপ্ত চোখে চোখ রাখতে পারছে না।
মাসীমা রিয়া কে উদ্দেশ্য করে আবার বলল : আচ্ছা মা বলছি,  তুমি যে কাজ করো সেটা নিয়ে তুমি খুশী, তুমি কি গর্বিত?
রিয়া বলল : হ্যা আমি আমার কাজে খুশী এবং গর্বিত।
মাসীমা পুনরায় জিজ্ঞাসা করল : আচ্ছা মা ,তুমি আরেকটু বলোতো তোমার এই কাজে আর কে কে খুশী?
রিয়া একটু ভেবে বলল কেন আমার স্বামী, পুত্র, মা, বাবা আত্মীয় পরিজনরাও খুশী। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন, এর সাথে শিক্ষকতা বা ওদের এত ছুটির কি প্রসঙ্গ? আপনি কি এইবার আমার কাজ নিয়ে প্রশ্ন করবেন?
মাসীমা হেসে বলল:  না রে মা, তোরা সবাই আমার মেয়ের মতন। তাই দেখ তুমি থেকে তুই হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা এলো না আমার মনে। তোকে, তোদের সবাইকে যে এত বকলাম কেন জানিস, আজকাল আশেপাশে আমাদের  মতন বুড়োবুড়ির দল গুলো চুপ হয়ে গেছে। অন্যায় গুলো হলেও কিছু বলেনা, এই ভেবে যে সবার হাসির পাত্র হবে। ভেবে দেখতো একবার; তুই নিজের পেশা নিয়ে এত গর্বিত সেরকম অন্য আরেকজনতো তার পেশা নিয়ে সমভাবে গর্বিত । কিন্তু তুই, তার পেশা নিয়ে উপহাস করছিস! এটা ঠিক না মা। আমি জানি না আর জানতেও চাই না তোর পেশার ব্যপারে, শুধু বলব অন্যের পেশাকে সম্মান না করলে তুই পুরো কর্মজগতের অপমান করবি।  আর শিক্ষক এমন এক শ্রেণী যার সামনে সমাজ নত হয় মন থেকে।
তাইতো, ঐ মেয়েটাকে আজ যখন খোঁচা দিলি শিক্ষকতা নিয়ে, তখন নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেললাম মনের কথা গুলো। কেন জানিস?

আজকে এই শিক্ষকের জাতটা কে খুব দরকার আমাদের। আজকে একটা বাচ্চা উচ্চশ্রেণীতে পড়ে কিন্তু খুব সাধারণ বিষয়েও জ্ঞান নেই! অ আ বা ইংরেজি শব্দ লিখতে পড়তে ভূলে গেছে।
তোরা ভাবতে পারছিস কি হতে চেলেছে আজ থেকে দশ পনেরো বছরের মধ্যে। এরা যখন জীবন যুদ্ধে প্রবেশ করবে এদের হাতে অস্ত্রই তো নেই, বিদ্যা নেই। সেই নিরক্ষরতার অভিশাপ ছোবল দেবে পুরো সমাজে । দু একজন খুব ভালো হয়তো হবেই কিন্তু সিংহভাগ কিছু জানবে না বুঝবে না।পুরো সমাজ হেরে যাবে রে !
তাই, শিক্ষকদের কাজ সামনে অসম্ভব কঠিন! ওদের উপর গুরুদায়িত্ব বর্তেছে; পাথরের জমিকে সুজলা সুফলা করে তুলতে হবে এক মরশুমের মধ্যে :  দুই-তিন বছরের শিক্ষা ক্ষত এক বছরে ঠিক করতে হবে! কি এক অসাধ্য সাধনায় এরা ব্রতী হয়েছে কল্পনা করতে পারছিস?  কি ভাবে করবে আমরাও জানিনা! তবে শিক্ষকের জাত তো যাদুকর! ওরা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথযাত্রী করতে পারে। ওদের উপর ভরসা আছে।
শিক্ষকদের পারতেই হবে। বাচ্চা গুলো যেন আবার লিখতে পড়তে বুঝতে পারে সেই প্রচেষ্টায় নিজদের নিমগ্ন হতে দে,বিপরীত কথা বলে শিক্ষকদের মনোবল ভেঙ্গে দিসনা তোরা। ভবিষ্যত সমাজ কিন্তু শিক্ষক দের হাতেই লালিত পালিত হতে পারে। ওদের আর কিছু শোনাস না, অনেক অনেক বিপরীত কিছু শুনেছে শিক্ষক সমাজ। এই অব্ধি বলে থামলেন মাসীমা।
পুরো ট্রেনএর কামরা নিস্তব্ধতায় ভরে গেছে।
সোমা কৃতজ্ঞচিত্তে বলল:  মাসীমা আপনাকে শতকোটি প্রণাম, আপনার মতন সবাই যদি এই ভাবে বুঝত!
পাশ থেকে সাথে সাথে রিয়া বলে উঠল : অনেক ভূল হয়ে গেছে রে সোমা, আমি- আমরা কেউ বুঝিনি তোদের উপর কি চলেছে! সত্যি তো তোরা আমাদের ভবিষ্যত কে নিয়ে ভাবছিস আর আমরা তোদের উপহাস করেছি। ক্ষমা করিস।
মাসীমা, আপনি আমাদের অনেক বড় এক জীবনের পাঠ পড়ালেন আজকে।  আপনাকে আগেতো তেমন দেখিনি এই ট্রেনে। কোথায় থাকেন আপনি? কথায় চেলেছেন?
মাসীমা স্নিগ্ধ হেসে উত্তরদিল : আমার পরিচয় জেনে কি করবি রে তোরা?
সোমা, রিয়া সবাই বলে উঠল বলুন না, আপনি কে? এত সুন্দর ভাবে বোঝালেন আপনি নিশ্চয়ই খুব উচ্চ শিক্ষিতা!

মাসীমা হেসে বলল :  ওরে না রে আমি কি সত্যি কিছু জানি?  আমি মানসগ্রামে একাই থাকি। একটা স্কুল চালাই; "বীণাপাণি নিকেতন"। যে পড়তে শিখতে ভালোবাসে আমার স্কুলের দরজা তার জন্য সবসময় খোলা আছে। আমি নিজে পড়াই না, বই খাতা রাখা থাকে। বিহু, শুকু নামে দুই মাস্টার আছে। ওরাই পড়ায় । আমি শুধু বসে বসে দেখি কতজন কত কিছু শেখে, বোঝে। আর কয়েকটা সাদা হাঁস আছে; সারাদিন ওদের পেছনে ঘুরঘুর করি ,আর গুণগুণ করে গান করি আপনমনে।
আমার বাবা আমদের গ্রামের আদি শিক্ষক ছিলেন।   অনেক কাল আগে গুরুপূর্ণিমা তে বাবা সামনেই যে স্টেশন আসছে সেই গুরুগ্রামে এসে এক পাঠশালা খুলেছিলেন , সেখনেই যাচ্ছি এখন। দেখি ওখানকার মানুষ কেমন শিখছে সব কিছু।

তবে,  মেয়েরা-মায়েরা- আজ আমি কিন্তু কিছুই করিনি, শুধুই চেষ্টা করে দেখলাম কিভাবে মনুষ্যত্বের পাঠ দেওয়া যেতে পারে।
আমার মতন বিদ্যে নিয়ে কি শিক্ষা দেওয়া যায় নাকিরে! আসল শিক্ষা দেবে তো শিক্ষকরা। আমার বাবাও তো শিক্ষক ছিলেন, তাই আমি শিক্ষকদের মাথায় করে রাখি। ওনারা না শেখালে আমার অজ্ঞ মনে এমন বিজ্ঞ পাঠ আসতে পারত না। শিক্ষকরা আমার সদা প্রণম্য।
তারপর হঠাৎ সোমার দিকে তাকিয়ে বললেন:  পারবি তো মা তোরা এই কঠিন সংগ্রামে জয় লাভ করতে ?
সোমা বিহ্বল ভাবে শক্ত চোয়ালে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বলল: "পারব, পারতেই হবে"।
ট্রেন গুরুগ্রাম স্টেশনে প্রবেশ করল, কামরার ভেতর থেকে সবাই দেখল সাদা বসন পরিহিতা এক মহীয়সী ট্রেন থেকে নেমে গেল।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"