"দুয়ারে রথ"

"বারবার বলেছি তোদের এতগুলো গাড়িতে ট্রায়াল দিতে পারব না। এই ভাবে হয় নাকি। আমি কিন্তু খুব রেগে গেছি ছোড়দা। আমার সব সাজ একদম শেষহয়ে গেল! তোরা একটা ফিক্সড গাড়ি ছেড়ে এভাবে এই গাড়ি সেই গাড়ি করে বেড়াচ্ছিস কেন বলতো? যখন যে গাড়ি পাচ্ছিস উঠে পড়ছিস! আগে তো এরকম করতিস না!" সুভদ্রা বিরক্তির সাথে বলে উঠল।
"দাদা কে বলো।" :  কৃষ্ণ বাঁশি টা হাতে নাচাতে নাচাতে উত্তর দিল বোন সুভদ্রা কে।
"মানে টা কি? আমাকে ও কি বলবে রে কানাই?" বড়দা বলরাম বেশ সন্দিগ্ধ ভাবে প্রশ্ন করল।

কৃষ্ণ আলগোছে বাঁশি টা ধরে সুভদ্রা কে উদ্দেশ্য করে বলল: বোন তোর  মনে পড়ে এক কালে আমাদের তিন জনের তিনটে প্রাইভেট গাড়ি ছিল। একবারে উঠতাম, তারপরে সোজা মাসির বাড়ি ল্যান্ডিং। কি কি সুন্দর গাড়ি, সুন্দর সব নাম তোর গাড়ির নাম: "দর্পদলন", বড়দার "তালধ্বজ", আর আমার "নন্দীঘোষ"। উফফ নাচতে নাচতে উঠতাম নেমে যেতাম ব্যস ৭ দিনের জন্য মুক্ত বিহঙ্গ । গুন্ডিচা মাসির বাড়ি কি আপ্যায়ন, মাসি কি সুন্দর সব খাবার দেয় আদর করে । বেশ চলছিল বছর বছর এইভাবে।
হঠাৎ বড়দার কি মনে হল, না নিজেদের উন্মুক্ত করতে হবে নাকি, অন্য রাজ্যেও প্রচার কেন্দ্র চাই। সাথে ফ্যামিলি প্যাক এর মতন - তিনটে না একটা গাড়িতেই ঠেসেঠূসে বসতে হবে, তবেই না লোকে বুঝবে "যে হাম সাথ সাথ হ্যায়" । এতে নাকি সংহতি বাড়বে, প্রেম আসবে মনুষ্য সমাজে।

তা, ঠিক সেই সময়েই বাংলা থেকে এক উচ্চমানের, সিংহ তেজে বলীয়ান কোমল মনের ভক্তকে পেয়ে গেলাম। মহাভক্ত চৈতন্য,
পুরীর রথ কে ও যেমন এক জনপ্রিয় ইভেন্ট করে দিল আবার নিজের রাজ্য বাংলাতেও আমার নামে প্রচার কেন্দ্র গড়ে তুলল। ওই কিন্তু সংকীর্তন এর নামে মিছিল এর প্রবক্তা; এটা একটা অসাধারণ কাজ করেছিল। এলিট সোসাইটি থেকে আমি মিশে গেছিলাম যেথায় থাকে দীনের থেকে দীন সেইখানে তে চরণ আমার রাজে। ধনী দরিদ্র উচ্চনীচ আবালবৃদ্ধবনিতা সব্বাইকে এককরে এক মিছিলে স্থান দিয়েছিল ঐ নদের নিমাই।
আমাকে খুবই ভালোবাসত ছেলে টা। যাই হোক ওর অনুপ্রেরণায় পুরী ছাড়াও মাহেশ, গুপ্তিপাড়া আর কিছু উচ্চবিত্ত বাড়ির মধ্যেও আমার প্রচার অভিযান চলল। বুঝলিতো বোন ভালোই লাগছিল,  মনটাও বেশ পুলকিত হলো এই ভাবে অন্য অঞ্চলে নিজের গাড়ি নিয়ে রাজবেশে বের হতে পেরে। তার থেকেও ভালো লাগছিল যে মানুষগুলো আমাকে যুগ যুগ ধরে মনে মনে বন্দনা করেও স্পর্শ করতে পারেনি, সেই অছুৎ বর্গ আমাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ অশ্রুতে বরণ করেছে ওদের মাঝে। এইভাবেই মন্দিরের অচলায়তন ভগবান থেকে সবার জগন্নাথ উঠলাম ধীরে ধীরে। এটাই আমার সবথেকে বড় প্রাপ্তি।

তারপরপরই বড়দা হঠাৎ একদিন বলে :  ভাইরে আমি নতুন স্কিম এনেছি প্রচারের । আমি বেশ খুশী খুশী মনে জানতে চাইলাম কি স্কিম ?

কি বলে জানিস: দুয়ারে রথ !!!

আমি আমার জগন্নাথ রূপের মতন চোখগুলো গোল্লা পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম: দুয়ারে রথ ! সেটা কি ব্যাপার দাদা?
দাদা জানালো :
প্রত্যেক বাড়ি থেকে নাকি রথ বেরোবে। বাড়ির মানুষ জন তোকে আমাকে বোনকে সাজিয়ে নিয়ে বের করবে রথে করে। বাড়ির সদস্যরা থাকবে পুরোভাগে।
আমিতো শুনে এক্কেবারে থ! বললাম দাদা এতদিন প্রচার তো বেশ ভালোই চলছিল। এক একটা বিশেষ দেশ,  কেন্দ্র থেকে কি বিশাল সংকীর্তনের  মিছিল বের হয়, এখন বাড়ি বাড়ি আবার ঘোরার ব্যাপার টা আসছে কেন?
দাদা বেশ গম্ভীরভাবে জানায় :  আজকাল লোকালবডি কানেকশান  বৃদ্ধি না করলে টিকতে পারবি না ভাই। কখন দেখবি পূর্ণ থেকে শূন্য হয়ে গেছিস।
আমি বললাম : কি বলছ দাদা, আমি শূন্য হয়ে যাব!! অসম্ভব, দেশ জুড়ে মন্দির আমার, কত কোটি ভক্ত!!
দাদা উত্তর দিল: নিজের পুরনো প্রবাদ গুলো ভুলে গেলি হতভাগা ? অতি দর্পে হত লঙ্কা, নিজেই এক অবতারে রাবনরাজ কে শিক্ষা দিলি অহঙ্কার পতনের মূল। এখন সেই নিজেই এক ভূল করছিস ভাই।
আর ধর্মঠাকুরের কেস টা তো হাতে নাতে প্রমাণ। বাংলায় ধর্ম ঠাকুর পুজো ছিল এক উৎসব এর মতন। কিন্তু ঐ এক ব্যাপার। প্রপার ব্র‌্যান্ডিং এর অভাব আর লোকের ঘরে ঘরে প্রচার বিমুখ থেকে এখন উনি সোজা অবলুপ্তির পথে  ।

তাই বলছি দুয়ারে রথের দরকার আছে ভাই। এটা তোকে আলাদা ফেভার দেবে ভবিষ্যতে। একবার চেয়ে দেখ ভবিষ্যতে তুই বছর বছর যে পরিমাণ নতুন গাড়ির মালিক হবি, সে পরিমাণ গাড়ি কেউ একজন্মে গুণেও শেষ করতে পারবে না। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে সারা ভূমি জুড়ে শুধু তুই আর তুই, ৭ দিন ধরে তুই লোকের মধ্যে মিশে থাকবি ভাই।

লোকের সাথে মিশে থাকার কথা শুনে আমি খুশীই হলাম। আমিও তাই চাই সবার সাথেই মিলেমিশে থাকতে।তাই দাদার কথা শুনে বুঝলি সুভু, আমি তো বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করলাম। ভাবলাম কিছু একটা যুগান্তকারী হবেই ,  ব্যস তারপর থেকেই এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। এখন তো আর পরিবর্তন করা যাবে না, হাজার হোক কমিটমেন্ট বলে একটা ব্যাপার তো আছে।

ঐ তো তিনটে বাচ্চা রথ নিয়ে বেড়িয়েছে চল চল বোন উঠে পরি।
বলরাম ও বলল:  হ্যা একদম, উঠে পর তোরা জলদি জলদি। যতদূর যাওয়া যায় দেখি। মাসির বাড়ি এখনো বেশ দূর। ওঠ ওঠ তোরা এক এক করে। আচ্ছা রথে উঠলেও সেই কথাটা মনে আছে তো রে? সুভদ্রা মাথা হেলিয়ে বলল: মনে আছে তো , রথে উঠলে আমাদের রূপান্তর হবে। হাত-পা থাকবে না। শুধু চোখ আর মুখ আর হ্যা অবশ্যই চেতনা কাজ করবে। নে ছোড়দা ওঠ এবার। তিন ভাইবোন  টুক টুক করে উঠে পড়ল রথে।

হেইই বাচ্চা, ওরে আস্তে দৌড়ো। ওরে আমার হাত এখন নেই এই রূপে, কিছু ধরতে পারছি না। ওরে বাপরে বাপ, একি গাড়ি রে। উফফ কোমর ধরে গেল ঝাকুঁনি তে। থামা রে থামা। ওওও দাদা এ কি রথে তুললে গো। সুভু ওরে,  এতো উড়ে উড়ে গেলাম পড়ে!  ওহহ নাকটাই গেলরে উড়ে, সারা গায়ে কাদামাটি মেখে সেই ছোট্ট বেলার ননী গোপাল হয়ে গেছি!
দাদা কি রথে তুললে , পুরো নাজেহাল হলাম। এই "দুয়ারে রথ"  আমাদের নাজেহাল করে ছাড়ছে। ও দাদা এরকম কেন করলে?
দাদা মিটিমিটি হেসে বলল আজকাল যুদ্ধটুদ্ধ না করে তোর শরীরে জং পড়েছে সাথে বুদ্ধিতেও মরচে ধরেছে।
কৃষ্ণ বলল দাদা একথা বলছ কেন?
বলরাম উত্তর দিল : তুই জগৎ এর নাথ। এই জগৎ এর প্রত্যেক বিন্দু তে তুই আছিস, এইবার তুইই আমাকে বল তুই সব বিন্দুতে থাকলে তোর বাহ্যিক  নাক ভাঙ্গল কি থাকল কি যায় আসে। বাহ্যিক নাক ভেঙ্গে যেখানে পড়েছে সেইখানেও তুই অব্স্থান করিস আবার তোর নাকের শূন্য স্থানেও তুইই আছিস। এই ব্রহ্মাণ্ডে ভর শক্তি যদি সব তুইই হোস তাহলে তোর তো এক রূপ থেকে আরেক রূপে গেছিস। তোর অবিনশ্বর অব্স্থার তো রূপান্তর হয়নি।


সুভদ্রা ও বলল হ্যা রে ছোড়দা, দাদা ঠিক বলেছে। কিন্তু ওরা দেখ তিনজন মলিন মুখে তোকে কি যত্নে কর্দমাক্ত ভূমি থেকে তুলেছে। ওদের সুন্দর পোষাক পরেই কাদায় নেমেছে। ওদের বাকি বন্ধুদের রথ দৌড়চ্ছে আর ওরা তোকে ঠিক করবার চেষ্টা করছে, দাদা তুই ঠিক হয়ে যা। আমার কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ঐ বাচ্চা গুলোর হাসি ফিরিয়ে দে এই উৎসবের দিনে।

কৃষ্ণ মিটিমিটি হেসে বলল তাহলে আমার বোন এর এই রথে সেই রথে চড়তে আর কোনো কষ্ট নেইতো। দেখলি তো বোন দুয়ারে না পৌছলে আমি কি সবার সুখ দু:খের ভাগিদার হতে পারতাম। যদি এক রথে করেই ঘুরতাম শুধু আমার প্রাচুর্য ধরা পড়ত। কিন্তু আমিই যদি ওদের মাঝে না যাই ওরা তো আমাকে অনেক দূরেই সরিয়ে রাখবে।

তবে আমি কিন্তু নিজে নিজের মূর্তি ঠিক করব না। ওদের কে নিজদের করতে হবে , শিখতে হবে।
আর ওরা নিজেরাই দেখবি ভালোবেসে আমাকে ঠিক করবে, আবার আমাকে নিয়ে দৌড়বে, এই ব্যুতপত্তি বোধ এসে গেলে ওরা নিজদের কর্মে দ্বিধাহীন ভাবে বার বার উত্তীর্ণ হবে নিজেদের পুরুষাকারের গুণে। আমি সেটাই চাই রে বোন। সবাই জগন্নাথ হোক, সবাই নিজের কাজে উদ্যমী হোক।
সুভদ্রা হেসে বলল না রে আর কোনো অসুবিধা নেই দাদা, আমি বুঝেছি ঐ দেখ ওরা কি করছে:

একটু পরে তিনটে বাচ্চা দেখল জগন্নাথ ভূলুণ্ঠিত, সাথে তার নাক গেছে ভেঙ্গে। তিন জনেই কাচুমাচু করে মূর্তি কে তুলে নিল বুকে। পাশে বৃষ্টির জমা জল আর কাদা মাটি দিয়ে মূর্তির ভাঙ্গা নাক জুড়ে দিল।
রথ আবার ছুটতে শুরু করল "জয়  জগন্নাথ" ধ্বনি তে চারদিক কাপিয়ে ।

তিনভাইবোন এক রথ থেকে আরেক রথে উপবিষ্ট হল সন্তুষ্ট চিত্তে।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

©️চিত্র অঙ্কন : ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।

©️ছবি : ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"