"বীরপুরুষ থেকে সাপুড়ে"
সে প্রায় দুই আড়াই যুগ আগের কথা। বোধ হয় প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণী তে উঠেছি। স্কুলে গরমের ছুটি পড়ে গেছে ।ঐ সময় পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর একটা বাতাবরণ তৈরী হত। আমাদের পাড়াতেও শুরু হল এই উৎসব এর মহড়া। সায়ক দা র মা, বাবা সহ পুরো পরিবারই সাংস্কৃতিক : কেউ তবলা বাজায় কেউ গান করে তো কেউ আবৃত্তি। পড়ায় এই গুরুদায়িত্ব পড়ল তাদের ই উপর। কাকিমা বেশ দায়িত্ব নিয়ে আমাদের মতন কচিকাচা দের জড়ো করে এক এক জন কে বলে দিল এক একটা কবিতা আবৃত্তি করতে হবে, গাইতে হবে বা নাচতে হবে।
আমি পড়লাম কবিতা পাঠের দলে। আমার এক বন্ধু গোবিন্দ ও এল দলে। গোবিন্দ আমার একদম পাশের বাড়ির বন্ধু, এটা ওর দাদুর বাড়ি,এখানে থেকেই পড়াশুনা করে । ওর মাসি খুব কড়া ,পারলে ওকে সারাদিন পড়ায় ।
যাই হোক এক এক করে কবিতা নির্বাচন করা হল কে কোনটা বলবে। গোবিন্দ পেল "কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি " , আর আমার ভাগ্যে পড়ল "বীরপুরুষ"। প্রথমেই আমার একটু রাগ হল সায়ক দা র মা কাকিমা র উপর, আমার কুমোর পাড়া মুখস্থ ছিল কিন্তু এখন আবার নতুন কবিতা মুখস্থ করতে হবে। যাই হোক এইবার শুরু হল প্রস্তুতি পর্ব।
গোবিন্দ ওর মাসির তত্বাবধানে কুমোর পড়ার গরুর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলল । দিবস রজনী আমি যেন তার পড়ায় পড়ায় ব্যাকুল, উঠতে বসতে মা হাকছে : দেখ ছেলে টা কে দেখে শেখ । সারাদিন কবিতা টা মুখস্থ করছে, আর তুই টই টই করে খেলে ধুলে বেড়াচ্ছিস । এর পর স্টেজে উঠে হা করে দাড়িয়ে থাকবি ।
এর পরেই মা জোর করে শুরু করত "মা কে নিয়ে যেন যাচ্ছি অনেক দুরে"।আমি মনে মনে গজ গজ করে ভাবছি : ধুস দুপুরের খেলা বন্ধ করা মা কে নিয়ে আমি কোত্থাও বেড়াতে যাব না!!!
যাই হোক এইভাবে প্রস্তুতির পর অনুষ্ঠান এর দিন এসে গেল। পড়ায় ছোটো বড় সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা কি হয় কি হয়, সবাই সেজে গুজে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে হাজির অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। আমরাও রেডি। কাকিমা বুঝিয়ে দিয়েছে প্রথমে সমবেত সঙ্গীত। তারপর গোবিন্দ র কবিতা, তার পর এক ছোট্ট বোনের নাচ তারপর আমার কবিতা। বেশ উত্তেজিত আবার বুকটাও কেমন একটু ঢিপঢিপ করছে। অনুষ্ঠান শুরু হল সুন্দর সমবেত সঙ্গীত দিয়ে "আমরা নতুন জীবনের দূত"।
এই বার মঞ্চে এল কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি। গোবিন্দ যাত্রা শুরু করবে সেই কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি নিয়ে। কিন্তু একি!!!! গোবিন্দ চুপ । কাকিমা বলছে শুরু করো গোবিন্দ। কিন্তু সে যথারীতি চুপ । ওদিকে গোবিন্দ র মাসি মঞ্চে প্রায় উঠে যায় যায়, চোখ দুটো ভাটার মতন জ্বলছে। কাকিমা বুঝে গেছে কিছু গন্ডগোল হয়েছে তাই নিজেই শুরু করল কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি চালানো। এক লাইন বলার পর গোবিন্দ বলে উঠল গাড়ি চালায় বংশী বদন ; আবার চুপ , এই বার এক বার করে কাকিমা এক লাইন বলে গাড়ি ঢিক ঢিক করে চলে।
যাক গাড়ির যাত্রা শেষ হতে না হতেই কানে এল এক তীব্র চিত্কার "তুই নেমে আয় আজ তোর একদিন কি আমার একদিন" মাসী অবতীর্ণ রণসাজে। ঐ দেখে গোবিন্দ এক লম্ফ দিয়ে স্টেজ থেকে নেমে বড় রাস্তার দিকে দৌড় দিল , মাসী ও পিছু নিল বিপুল বেগে। এই দেখে আমি বীরপুরুষ থেকে পুরো সাধুপুরুষ হয়ে গেছি। ভাবছি : গোবিন্দ সারাদিন পড়ে তাও থেমে থেমে ঢোক গিলে বলেছে, আমি তো পুরো ডোবাব। হা রে রে ভাবলেই ডাকাত ভুলে মনে হচ্ছে গোবিন্দর মাসী আসতেছে ডাক ছেড়ে।।
একটা বোন নেক্সট ছিল সেও মোটামুটি নাচতে গিয়ে "প্রজাপতি প্রজাপতি" গানে আপন মনে যেমন খুশী নাচছে। সঞ্চালক কাকিমার মাথায় হাত।
আমাকে ডেকে বলল: তুই পার্বি তো রে?
আমি বললাম : হ্যা হ্যা নিশ্চয়ই পারব, কিন্তু নিজে মনে মনে বললাম : পৃথিবী উল্টে গেলেও আমি আজ আর বীরপুরুষ নৈ।
যাই হোক মঞ্চে উঠলাম । সামনে কালো কালো মাথা আর আলো দেখলাম, নমস্কার করে বলে উঠলাম :
"বাবুরাম সাপুড়ে কোথা যাস বাপুরে...... " ।
🙏🏼নমস্কার🙏🏼
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন