"তথ্যপ্রযুক্তি আর বিয়ের সম্বন্ধ"
এ আবার কি বিষয়!!! কোথায় এক গোমড়া মুখো গুরুগম্ভীর প্রযুক্তির আলোচনা আর কোথায় এক আনন্দ উৎসব,দুটি মন দুটি প্রাণের মিলন , দুই পরিবার এর "হাম সাথ সাথ হ্যয়" এর সূচনা। এই দুটো কি কখনো এক আসনে বসতে পারে নাকি! অসম্ভব ব্যাপার তো এটা।
কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে দেখবেন তথ্যপ্রযুক্তি ও বিয়ের সাদৃশ্য সত্যিই অপূর্ব। কিন্তু কি ভাবে? না না, আলোচনা একদমই গুরুগম্ভীর ভাবে এগোবে না। এই বিবরণ হবে মাধ্যমিকে কূনোব্যাঙ এর পৌষ্টিক তন্ত্রের একটি সচিত্র বিবরণ এর ন্যায় স্বচ্ছ।
আচ্ছা বিয়ের জন্য প্রথমেই কি করতে হয় বলুন তো?
পূর্বরাগ থাকলে প্রণয় নিবেদন আর তা না হলে পাত্রপাত্রীর সন্ধান। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একদম এক ব্যাপার। তথ্যপ্রযুক্তি তে প্রধান বিষয় হল প্রজেক্ট এবং এই প্রজেক্ট কে ঘরে নিয়ে আসা হয় নববধূর মতন, পর্যায় গুলো একটু উন্মোচন করলেই সম্পূর্ণ বুঝে যাবেন। শুধু এক্ষেত্রে পাত্র ছাদনা তলাতেই প্রথম নববধু কে দেখে, অনেকটা ১৮০০ শতকের বঙ্গ সমাজের মতন: বাবার পছন্দ করা পাত্রী কে বিবাহ বাসরে দর্শন।
প্রথমেই ক্লায়েন্ট বিবাহযোগ্যার গুরুজনদের মতন বিজ্ঞপন দিয়ে একটি চিঠি পাঠায় যে একটি সুলক্ষণা তনয়া স্বরূপ সম্ভাবনা আছে যদি কোনো স্বাবলম্বী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা থাকেন তাহলে সত্ত্বর যোগযোগ করুন এবং এই সম্ভাবনা কে প্রজেক্ট বানিয়ে ধন্য করুন।
অনেকেই এর সাথে ফুট নোট দেয় পাত্রস্বরূপ সেই সংস্থার নিজস্ব অফিস, লোকবল এবং উন্নত মস্তিষ্ক আত্মীয়বল থাকতে হবে, তাহলেই যোগযোগ করবেন।
এই চিঠি পেয়েই পুরো আক্রমণাত্মক মেজাজ এ প্রযুক্তি সংস্থার গুরুজনরাও ঝাপিয়ে পড়লেন। শুরু হল "আর এফ পি" নামক একটি গালভরা কর্মকাণ্ড যার আসল উদ্দ্যেশ্য পাত্রী র বাড়িতে প্রথম চিঠি পাঠিয়ে জানানো : "জানেনতো আমাদের বিশাল ঐতিহ্য, আপনাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আমরা একান্ত ভাবেই কামনা করি, প্রথম ব্রাকেট এ লেখা থাকে( আমাদের একটা সুযোগ দিন স্যর)"।।
যাই হোক প্রজেক্ট রুপী পাত্রীর বাড়ি থেকে দেখা করার সম্মতি পত্র এলেই তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় হৈ হৈ ব্যাপার শুরু , সবাই "খেলা হবে" বলে ঝাপিয়ে পড়ল ময়দানে।
পাত্রী কেমন হবে, তার বর্তমান বাড়ি কোন ইট বা তথ্যব্রিকস এ তৈরি থেকে শুরু করে ,বিয়ের পর পাত্রী কি নিজের একতলা বাড়িতে থাকতে পছন্দ করবে না কি মেঘের দেশে ফ্ল্যাট এ থাকতে চায়, হঠাৎ হঠাৎ উড়ে উড়ে দেশ বিদেশের কাজ করবে , নাকি দশটা পাচটা র ব্যাচ এ জীবন চলবে, বলতে গেলে সব বিষয়ে খোজ পড়ে যায়। বাড়িতে দিন রাত মিটিং মিছিল এর বন্যা শুরু হয় । এক এক আত্মীয় কে এক একটি বিষয় এর দায়িত্ব অর্পণ করা হয় । তারাও আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বলতে থাকে প্রজেক্ট রুপী পাত্রী তো অনন্যা;
বিশেষজ্ঞের মতন কেউ বললেন পাত্রীর স্মৃতি তো হাতির মতন বৃহৎ; অনেক তথ্য মনে রাখতে পারবে । কেউ বললেন ধুস তুমি বোঝনি পাত্রী আসলে ময়ূরের মতন তন্বী । কেউ ধমকে বললেন রাখতো এ আর কিছুনা সিংহ এর মতোই বলশালী ।
এদের সব বাণী শুনে গুরুস্থানীয় ব্যক্তি মনে মনে হাতির স্মৃতি, ময়ূর এর লেজ আর সিংহের শক্তি জুড়ে বললেন এটা আসলে তিমি র মতন। তোমরা তো বুঝতেই পারোনি আমরা কত বিশাল এক প্রজেক্ট পেয়েছি।
হীরকরাজের মন্ত্রী রা মাথা নেড়ে সমর্থন করল "ঠিক ঠিক"।
যাই হোক শনাক্তকরণ পর্ব তো হল অনেক কষ্টে সৃষ্টে। এইবার পাত্রী দেখতে যাবার আগে সবার উত্তেজনা চরমে। "এ যে কি অমূল্য রতনের সন্ধান পেয়েছি এ যেন হাতছাড়া না হয় ,খবর এসেছে আরো দুই তিন কুলীন ঘর ও এদের সাথে কুটুম্বতা করতে চায় " :
সুতরাং ওরা ভীমনাগ এর সন্দেশ নিয়ে গেলে আমরা ভীমনাগ,কেসি দাশ এবং নকুড় সহ সব ভালো মিষ্টি নিয়ে যাব।
এইভাবে বার্তালাপে ও তিমিরুপী পাত্রী র কল্পনায় গুরুজনদের পাকা দেখা পর্ব ও সম্পন্ন হল । দুই পরিবার এর মধ্যেই একটা খুশী খুশী ভাব । "এস ও ডব্লু"(স্টেটমেন্ট ওফ ওয়ার্ক) এর নামে বিয়ের কার্ড ও ছাপান হল।
দুজনেই ভাবছে জিতেছি, পাত্র পক্ষ ভাবছে ঘরে তে তিমি আসছে গুণগুনিয়ে। বাকি সব ডিপার্টমেন্ট এ নেমন্তন্নের কার্ড গেল ইমেল মারফত , সাথে প্রশংসা সেই সব গুরুজন দের জন্য ; এই বিশেষ সম্বন্ধ যে আজ বাস্তবায়িত। কিন্তু আড়ালে হাসেন অন্তর্যামী রুপী পাত্রী পক্ষের গুরুজনরা : ক্লায়েন্ট সম্প্রদায়।
বিয়ের দিন পাত্রপক্ষের সবাই বরযাত্রী হয়ে আনন্দে মশগুল। হঠাৎ শুভদৃষ্টি র আসর থেকে দেখা গেল বর তীব্র চিতকার করছে ।ওহহ বরের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আসলে বরের আগমন তো হলে ছাদনা তলাতেই, বর নিজেও দেখেনি পাত্রী কে। বর কোম্পানি তে কোড করে, গালভরা নাম সফ্টওয়্যার ডেভলপার, সব প্রজেক্ট কে পার করবার প্রধান কাণ্ডারী। অনেকটা ঠিক কনিষ্ঠতম সদস্য যে যাত্রা দলে পাঁচ টাকা পায়, তবুও মন্দ নয় সে পাত্র ভালো ।।
সেই বর ই, বরাভয় ভুলে বর্বর এর মতন ভয়ার্ত গলায় চেচিয়ে বলছে : " বাবামশাই যে বলেছিলেন তিমির সাথে ঘর করব কিন্তু ঘোমটা তুলে দেখছি তিমি কোথায়? এ.... যে মাংসাশী ডাইনোসর .....ভয়ংকর টিরাইনোসেরস, এ কোথায় এসে পড়লাম বিশ্বাস করে "।
এরপর,
এরপর আবার কি? টি রেক্স তাড়া করল বর কে, বর বাচাও বাচাও করে চার দিক ছুটতে লাগল।
ওদিকে গুরুজন দের মোবাইল এ টিং টিং করে নতুন চিঠি ঢুকল "আমাদের একটি অতি সুলক্ষণা আইডিয়া আছে, প্রজেক্ট হিসেবে বাস্তবায়িত করতে চাই "..........
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন