কুবাক্য যদি বা কয় । কুমানব কথাপি নয় ।।
কি ভাবছেন? কুবাক্য ,কুমানব এই সব লিখছি তার মানে লেখাতে নীল সাদা মেঘে রোদ্দুর এল গুণগুণিয়ে।
না , একদম ই না। যা গরম উফ্ফ; রোদ, নীল-সাদা তো এখন চাই না; একটু বারি ধারাই চাই। যাই হোক কুবাক্য নিয়ে একটা অভিজ্ঞতার কথাই বলি তাহলে।।
বছর ১৮ আগের কথা। সবে কলেজ এ উঠেছি। অনেক নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে। কেউ অন্য শহর তো কেউ অন্য জেলা থেকে এসেছে । ছোটন এর সাথে আমার পরিচয় এই পর্বেই। ছোটন এর রেজাল্ট বেশ ভালো, সাথে মায়া মাখানো একটা মুখ। দেখলে বন্ধু কম ভাই বেশী মনে হত। যাই হোক ভালো বন্ধুত্ব হল ওর সাথে।
ইঞ্জিনিযরিং কলেজ , সেই হিসেবে উচু ক্লাসের দাদাদিদি রা পরিচয় পর্ব নামক ঐ একটু আধটু মজা করছে, নতুন নতুন দুই, তিন ,চার অক্ষর এর ইন্টারেষ্টিং ইন্টারভিউ হচ্ছে। আমি কিছুটা পরিচিত সেই সব শব্দ ভাণ্ডার এর সাথে ,মোটামুটি পাশ মার্ক পাচ্ছি। অসুবিধায় পড়ল ছোটন, একে খুব ভালো ছেলে, যে "বউএর ভাইএর এক কথায় প্রকাশ" শুনলে জিভ কাটে তাকে পরীক্ষায় ডাকল দাদাদিদি রা। দেবশিশু তো নাকাল এর একশেষ, তিন চার তো দূর, দুই অক্ষর এই আটকে গেল । শাস্তি স্বরূপ ভিআইপি রোড এ প্রতি মিনিট এ গাড়ি গুনে চেচিয়ে চেচিয়ে বলে সেদিন এর মতন ছাড়া পেল।।
বেরিয়ে এসে বলল ভাই আমার জিভ এর এই অপমান আমি মেনে নেব না। আমাকে এই মহাভাষা শিখতেই হবে, না হলে এ সমাজ কি আমাকে মেনে নেবে ,গ্রহণ করবে?
বিজ্ঞের মতন পিঠ চাপড়ে বললাম কোনো চিন্তা নেই লেগে পড়। তবে জানিস তো শিক্ষার প্রধান উপায় হল ব্যবহারিক প্রয়োগ। তুই যত প্র্যাক্টিস করবি তত তরতরিয়ে এগিয়ে যাবি উচ্চতর ভাষাজ্ঞান এ, দুই থেকে তিন, তিন থেকে চার এ পৌছে যাবি। আর যদি চার এর বেশী শিখতে চাস সেক্ষেত্রে কল্পনা শক্তি কে কাজে লাগাবি।
ব্যস ছোটন পুরো উত্তেজিত। সকালে দেখা হওয়া থেকে সন্ধ্যের সময় বাড়ির পথ ধরার আগে অব্ধি শুরু করে দিল আবৃত্তি। মাঝে মাঝে মানে না বুঝে শব্দের লিঙ্গান্তর না করেই বলে যাচ্ছিল, এই সব ব্যাকরণ এর ভূল গুলো আমি ও আমার মতন ওর কিছু শুভানুধ্যায়ী শুধরে দিচ্ছিলাম। পরে ভেবে দেখেছি সেইটা অন্যতম ঐতিহাসিক ভূল ছিল।।
এরমধ্যে কলেজে সবে রিলায়েন্স এর মোবাইল নিয়ে যেতে শুরু করেছি। আমার দেখাদেখি ছোটন ও নিল সেই রিলায়েন্স এর মোবাইল। সেই মুঠোফোন ও বলে উঠল "ভাষা হোক উন্মুক্ত"। এস এম এস এর মাধ্যমে দুই তিন চার অক্ষর এর বার্তা উড়ে উড়ে আসতে থাকল জাম্বো জেট গতিতে।
সেই যুগে মোবাইল টা ছিল পারিবারিক সম্পত্তি। ছেলে মেয়ে রা একটু ফ্যশন আইটেম হিসেবে কলেজে নিয়ে যেত, বাবা অফিস এর মিটিং এ একবার দুবার হয়ত বের করত স্টেটাস সিম্বল হিসেবে। ছোটবাচ্চারা মজার মজার সাপ ব্যাঙ খেলত মোবাইল এ। মা মাসি পিসি রা মোবাইল থেকে ফোন করেই হ্যালো বলার আগে প্রথমেই বলে নিত মোবাইল থেকে কথা বলছি : মুখমন্ডলের অভিব্যক্তি তে মনে হত দেবী দূর্গার ছটা।
সেরকম ভাবেই আমাদের পরিবারেও মোবাইল ছিল গণসম্পত্তি।
এরমধ্যে একসাধারণ সন্ধ্যে বেলায় টেবিল এ বসে দই মুড়ি খাচ্ছি , বাবা অফিস থেকে এসে চা পান করছে আর গল্প চলছে টুকটাক। মা রান্নাঘরে কাজ সারছে। ভাই মোবাইল নিয়ে খেলছে ।
হঠাৎ মোবাইল এ পিং পিং শব্দ। এস এম এস ঢুকল । ভাই বলল : দাদা তোর এস এম এস । তোর বন্ধু ছোটন দা কি লিখেছে রে এগুলো? বলছি শোন।
উদাত্ত কণ্ঠে পড়তে শুরু করল।
আমার দই মুড়ি মুখে ভর্তি, ক্ষুদে চোখ গুলো রসগোল্লা হয়ে গেছে, ছোটন মেসেজ পাঠিয়েছে আর ভাই সেটা পড়তে চলেছে সর্বসমক্ষে !!!!! ভাই পড়তে থাকল ভেঙ্গে ভেঙ্গে থেমে থেমে এক একটা শব্দ ধীরে ধীরে।
বাবা চুপ চাপ চা খাচ্ছে ,মিটি মিটি হাসছে। বুঝলাম ,কিউ কি হোস্টেলবাসী বাবা ভি কভি কলেজ মে থি!!
আমিতো গলায় খাবার আটকে প্রায় উদম বিষম খেতে চলেছি । হিরোশিমা নাগাসাকিতে কি হয়েছিল জানি না কিন্তু সেই উত্তাপ আমি বাড়িতে বসেই টের পেলাম, ভীমবেগে দৌড়লাম মোবাইল ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু মন্ত্রপাঠ শেষে মেসির মতন পাস কাটিয়ে ভাই বাবার সামনে এসেই জিজ্ঞেস করছে "দাদা মানে কিরে এই শব্দ গুলোর , ছোটন দা কি লিখেছে মানে জানি না" ।
আমি মোবাইল টা নিয়ে এক লাফে সোজা তিনতলায় দৌড়লাম। ছোটন কে গুরুমারা বিদ্যা র প্রতিদান ও দিলাম দারুণ অগ্নিবানে।
পরের দিন সকালে কলেজ গিয়ে দেখি ছোটন কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। মৃদু স্বরে বলল : তোকে কি আর মেসেজ পাঠাব না ভাই?
একটু ঘ্যাম নিয়েই বললাম : মেসেজ পাঠাবি না কেন, অবশ্যই পাঠাবি। শুধু ভাষা চর্চা করবার আগে একটা মেসেজ পাঠিয়ে অপেক্ষা করবি, রিপ্লাই দিলে গঙ্গা যমুনা বইয়ে দিবি।
সাথে সাথে ছোটন জটায়ু র মতন লাফিয়ে উঠেই একটা পাচ অক্ষর এর প্রয়োগ করল। দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম।। মনে মনে বললাম :
"কুবাক্য যদি বা কয় ।
কুমানব কথাপি নয় ।।"
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন