প্রথমে সংক্ষেপে ৩ নম্বরের টিকা লিখে তারপর ১৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন বিস্তারিত লেখো।।

 তোদের দেশের এই পানীয় টা কিন্ত একঘর ভাই :  বলেই সৌম্য এক একনিমিষে গ্লাস শেষ করে শাল এর কোলে বসলো। পলাশ এর দিকে তাকিয়ে বলল:  কিরে বিপ্লবী, একটা গান ধর তো। এই শালের বনে গান না হলে জমে নাকি রে!

উদাস পলাশ আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল:  তুই যা টানছিস তোর এখন গিটারের টুং টাং এ কিছু হবে টবে না। যা গিয়ে সুনীল কে বল তোর জন্য লাইভ নাচা গানা র ব্যবস্থা করে দেবে।

সৌম্য একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলল :  বাব্বা কি রেলা মাইরি তোর! একটা গান করতে বললাম আর তুই সুনীল এর দিকে পয়েন্ট করে দিলি।

পলাশ গম্ভীরভাবে বলল : আমি যে ধরনের গান করি তাতে বিপ্লববাদ, সমাজে চেতনা বোধ এর জন্ম দেয়, তোর মতন মদ্য মাতাল কে এই গান শুনিয়ে লাভ নেই, তোর জন্য হাঁড়িয়া মহুয়া খেয়ে ঐ পিন্দরে পলাশের বন আমার দ্বারা হবে না!

"দেখলি সুনীল, দেখলি কি সব ফালতু কথা বলে যাচ্ছে। ও বড় বিপ্লবী আমার, কি যে বিপ্লব করে সে তো জানাই আছে । বুকের মধ্যে চে এর ছবি লটকে   আগডুম বাগডুম বলে বেড়ায়। আরে মদের ব্যপারে তুই কি বুঝবি রে! দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস তোরা মানিস নাকি। জানিস পুরাকালে ঋষি রা সোমরস পান করত। এই জঙ্গলে তো সোমরস পাব না তাই লোকাল  হাঁড়িয়া, মহুয়া ই চলছে " : একদমে কথা গুলো বলে আগুন চোখে তাকিয়ে রইল সৌম্য।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনীল দুজনের দিকেই ফিরে তাকাল। পরশু কলেজ শেষে তিন বন্ধু মিলে ঠিক করেছিল কোথাও বেরিয়ে আসবে, মাত্র দুই দিনের মতন কাছে পিঠে কোথাও। সুনীল তখন নিজের থেকেই বলে:  যাবি আমাদের গ্রামে? শুনে দুজনেই বলল : বলিস কি, গ্রামে যাব বেড়াতে? কি আছে গ্রামে?
সুনীল হেসে বলল "আরে এ গ্রাম সেই সুজলা সুফলা গ্রাম না, বীরভূম এর  অনেক ভেতরে লাল মাটির গ্রাম আর শীত কালে বেশ ভালোই লাগবে। তোরা তো কলকাতার বাইরে মানে দেশে বিদেশে  বেড়াতে গেছিস কিন্তু লাল মাটির দেশে তো যাসনি; চল আমাদের বাড়ি। মা বাবা খুব খুশী হবে।" দুজনেই আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে রাজি হল। হিপ হিপ হুররে করে বেরিয়ে পড়ল সুনীল এর দেশে, বীরভূমে। তবে এসে থেকেই সৌম্য আর পলাশ এর মধ্যে কোল্ড ওয়ার লেগেই আছে।
সুনীল মনেমনে ভেবে দেখল : এটাইতো স্বাভবিক যে ছেলে দুটো কলেজে উঠতে বসতে দুজন দুজনকে প্রতিনিয়ত উত্যক্ত  করে তারা এই মুক্ত পরিবেশে থাকলে হাউ মাউ তো করবেই।
সুনীলই একমাত্র ওদের মধ্যে চুপচাপ থাকে আর দুই মক্কেল ওকেই দয়াল বিচার কর বলে আপিল করে !! দুজনেরই দাবি ও যেহেতু অবলোকন কারী জনতা তাই ওর মত হবে নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য। তবে যতই বিতর্ক ঝগড়াঝাঁটি হোক ত্রিমূর্তি সর্বদা সর্বত্র একসাথে থাকে।

কিছুভেবে নিয়ে দুজনকেই উদ্দ্যেশ্য করে সুনীল বলল : আচ্ছা তোরা শেষ দশ মিনিটে যে কথা গুলো বললি সেই গুলো তোরা কি নিজেরা নিজদের কাছে যাচাই করেছিস কখনো ?
পলাশ সৌম্য দুজনে প্রায় একসাথেই বলল : মানে টা কি? না জানলে না মানলে বলবো কেন? হ্যা দুজন দুজনের মত না মানলেও নিজের নিজের মতের প্রতি আমরা আস্থাশীল। তুই কেন বললি এই কথাটা বোঝা।
সুনীল বলল সে বলছি কিন্তু এক এক করে । প্রথমে পলাশ এর সাথে আলোচনা করি।

সুনীল শুরু করল : পলাশ তুইতো বললি তুই বিপ্লবের গান করিস, বিপ্লববাদ মানিস, চে এর ছবি আঁকা জামা পড়ে জানান দিস তুই বিপ্লবী, তাই তো?
পলাশ : হ্যা অবশ্যই বিপ্লববাদে বিশ্বাসী । চে আমার আদর্শ । আর চে কে তাই আমি বুকের মাঝে রাখি ।
সুনীল: খুব ভালো, তবে আমার একটা প্রশ্ন অনেকদিনের, তোকে করব করব করেও করিনি।
পলাশ একটু থেমে বলল : কি প্রশ্ন?
সুনীল : আচ্ছা তুই যে লালমাটির  দেশে দাড়িয়ে আছিস এর মধ্যে থেকে যদি তুই চে এর মতন কাউকে খুঁজে পাস তার ছবি কি নিজের বুকে মেলে ধরবি তো সবার সামনে?
পলাশ হো হো করে হেসে বলল : এই গণ্ড গ্রামের কেউ চে এর সমতুল্য হবে!! কি বলছিস ভাই আইডিয়া আছে তোর। সরি গন্ডগ্রাম বললাম বলে, কিন্তু এটা মানতে পারছি না এখানে কেউ চে এর সমতুল্য আছে। তুই জানিস তো চে কি করেছে? তোর বিপ্লবী কি চে এর থেকেও বড় নাকিরে ?

সুনীল স্মিতহেসে বলল : হ্যা জানি তো । চে এর মতোই প্রতিবাদী ভাবমূর্তি যা আছড়ে পড়েছিল ভয়ংকর শাসক এর বিরুদ্ধে ,দল বানিয়েছিল সবার সামনে প্রতিবাদীর স্বরে বলেছিল এই মাটি আমাদের, পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছে বিপ্লবের বিদ্রোহের চেতনায়। ক্ষুদ্র আদিম হাতিয়ার নিয়ে নির্ভয়ে লড়েছে বন্দুক কামানের সামনে। নিজদের অধিকার, মা মেয়েদের সম্মান রক্ষায়, নিজদের ভূমি ছিনিয়ে নিতে লড়েছেন এঁনারা।

পলাশ একটু বিস্মিত হয়ে সৌম্য কে বলল:  সৌম্য এরকম উদ্যত উন্নত শির এই খানে হতে পারে নাকি?

দাড়াতো তুই, ওক বলতে দে তো আগে। বল ভাই সুনীল, আমিও বুঝতে পারছি না এই খানে চে এর তুল্য কেউ ছিল আর সেটা আমরা জানিনা!!
:  সৌম্য অবাক হয়ে বলল।

সুনীল শান্তভাবেই উত্তর দিল : দেখ সত্যি বলতে আমাদের  মনে আসবে না এদের কথা। আসবেই বা কেন? আমরা কি নিজদের গৌরব নিয়ে আলোচনা করি?
আমি তো আমাদের এইখানের বিদ্রোহী মুখ এর কথাই বলছিলাম ভাই। এরা যদিও দুই ভাই ছিল : সিধহো, কানহো।  এরা নিজ মাতৃভূমির রক্ষার জন্য প্রবল প্রতাপান্বিত ইংরেজ দের সঙ্গে লড়াই করেছিল এই লাল মাটির জন্য; এই শাল পিয়ালের জঙ্গলের জন্য ১৮৫৫ সালে, যখন কলকাতার বাবুসম্প্রদায় বোঝেইনি বিপ্লব কি, বিদ্রোহ কি !
দুই ভাই বিশাল দলনিয়ে তখন মিছিল করে অগ্রসর হয়েছিল । সেই যুগে মনে করা হয় এটাই প্রথম মিছিল ভূভারতে ।  দেখ, চে তো নিজেই বলেছেন : "শিক্ষা আনে চেতনা; চেতনা আনে বিপ্লব"।
কিন্তু এই দুই ভাই তো প্রচলিত আধুনিক শিক্ষার স্পর্শও পায়নি। তবুও তারা সেই যুগে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল।  আমার কি মনে হয় জানিস
চে যদি নিজেও এদের বিষয়ে জানতেন তিনি অবশ্যই এদের সেলাম জানাতেন ।

তুই কি জানিস এই বিদ্রোহী রা দুই ধরনের তীর ব্যবহার করত। এক তীর যাতে বিষ মিশে থাকত কিন্তু সেই তির তারা প্রবল শত্রু কেও নিক্ষেপ করত না, বিষ মাখা তীর  ব্যবহার করত পশু শিকারে। আর শত্রুর জন্য বরাদ্দ ছিল বিষ হীন তির, শত্রু র মৃত্যু তাদের কাম্য ছিল না, নিজদের আত্মরক্ষার জন্য নিক্ষেপ করত। নিজদের শত্রু কেও মানুষ ভাবত, পশু নয় । ওদের এই মনুষ্যত্ব বোধ কোন পুস্তক এর শিক্ষা থেকে পাওয়া যায় বলতো? সূক্ষ সহনশীলতা, মনুষ্য মর্যাদার এ এক অনন্য নজির।

তথাকথিত সভ্য সমাজ কিন্তু শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণহরী অস্ত্রই ব্যবহার করে । ইংরেজ রাও তাই করেছিল, সাথে জুটেছিল মহাজনের দল। অসংখ্য সাঁওতাল মারা যায়।

তাই বলছি , বিপ্লবীর কোনো জাত হয় না ভাই, ছোট বিপ্লবী বড় বিপ্লবী হয় না। অন্যায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর ভেসে উঠলেই  বিদ্রোহী বিপ্লবীর জন্ম হয়, সেটা ডান, বাম, মধ্য , ধর্ম , সর্বধর্ম সবার জন্য প্রযোজ্য । কিরে পলাশ ভূল বললাম কিছু?

পলাশ অপলক দৃষ্টি তে বিহ্বলতার সাথে বলল :  ঠিক বলেছিস তুই।আমি এতদিন আমার দৃষ্টিতে একদিক থেকেই ভাবতাম বিপ্লব বিদ্রোহ আস্তে পারে।
কিন্তু তুই যা বললি চোখ খুলে গেল। বিপ্লব,বিদ্রোহ সর্বাত্মক। যেখানে অন্যায় চোখ রাঙাবে বিপ্লব আসবেই আসবে।
আসলে ছোটবেলায়  দেখেছি : ইতিহাসে তিন নম্বরের টিকা আসত সাঁওতাল বিদ্রোহ, তারপরেই আসত ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহের বিবরণ ১৫ নম্বরের । আর কলেজে উঠে পড়লাম  চে এর ডায়েরি। আমাদের মননে ঢুকে গেল সিপাহী বিদ্রোহ মানে বড় কিছু তাই ১৫ নম্বরে আসে,
চে চেতনা একটা বই এর মধ্যমে আসে তার মানে আরো বড় বিদ্রোহ। আর সাঁওতাল বিদ্রোহ তো তিন নম্বরের নোট , এর মধ্যে আটকে বিপ্লব হয় না।

তুই ঠিক বলেছিস  সুনীল, পৃথিবীর সব বিপ্লবী মহান। অন্যায় অবিচার  এর বিরুদ্ধে যে লড়বে সেই বিপ্লবী । অন্যায় এর বিরুদ্ধে লড়েছে এটাই তাদের স্বাক্ষর।
আর হ্যা যদি কোনোদিন সুযোগ পাই আমিও পরব সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক দের জামা, সগর্বে বলব বিপ্লব সবার মঙ্গল আনুক। বিপ্লব সবার।

সুনীল সৌম্য এসে জড়িয়ে ধরল পলাশ কে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"