দলছুট এর দলে ফেরা ।।
রোল নম্বর তিন: উপস্থিত স্যর। রোল নম্বর চার: উপস্থিত স্যর । রোল নম্বর পাঁচ : ... রোল নম্বর পাঁচ::
স্যরর.. ও এসেছে কিন্তু এখনো ক্লাসে ঢুকতে পারেনি ঐ দেখুন : ক্লাস মনিটর ঋদ্ধি জানাল ।
এসেছে কিন্তু ক্লাসে ঢোকেনি এর মানে টা কি? নাম ডাকার খাতা থেকে মুখ তুলে ক্লাস টিচার তাকালেন।
মনিটর ঋদ্ধি বলল : স্যর ও ক্লাসে আসেনি কিন্তু স্কুলে এসেছে। গেটে বাহাদুর দা আটকে রেখেছে ঐ দেখুন, মনে হয় ট্রেন লেট করেছে।
ও তো বিরাটি থেকে আসে; সাথে দেখুন যমজ ভাই, বিজয় , শিব সহ ওরা সবাই আছে পুরো; প্রবাসী বাহিনী এই বারাসাত গভর্নমেন্ট স্কুলের ক্লাস এইটের।
ঐ দেখুন স্যর, অ্যাসিস্টেন্ট হেডস্যর যাচ্ছেন ওদিকে।উনি, ওদের এইবার ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। হঠাৎ সমস্বরে পুরো ক্লাস বলে উঠল স্যর দয়া করে একটু দেখবেন যাতে ওরা ঢুকতে পারে, ফিরে না যায় । ক্লাসটিচার স্যর মুহূর্ত কাল স্থিরবৎ হয়ে কিছু ভাবলেন তারপর তড়িৎ গতিতে নাম ডাকার খাতা বন্ধ রেখে স্কুল গেটের দিকে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলেন।
পুরো ক্লাস এইট নড়ে চড়ে বসল। কয়েকদিন আগেই একটা হিন্দি চলচ্চিত্রের বেশ নাম হয়েছে; পুরো ক্লাস উত্তেজনায় তাকিয়ে রইল প্রতিষ্ঠা অনুশাশন পরম্পরায় সিক্ত অ্যাসিস্টেন্ট হেডস্যর এর সন্মুখে দুহাত ছড়িয়ে পরিবর্তনকে অভিনন্দনকারী ক্লাস টিচার এর সুপার হিট মুকাবিলার মুহূর্ত। ঋদ্ধি বেশ ঘ্যাম নিয়ে বলল: দেখলি কি ভাবে বললাম , পারতিস তোরা এই ভাবে প্লেসিংটা করতে? বলেই মনিটর সুলভ একটা বিজ্ঞের হাসি দিল। পুরো ক্লাস বলে উঠল বলেছিস ভালো করেছিস, কিন্তু সমর্থন পুরো ক্লাস করেছে, সবাই চেয়েছে ওরা ক্লাসে আসুক।
"কিরে কি হয়েছে তোদের ট্রেন লেট করেছে তো? আমিও তো আজ কোন ভোরে বেরিয়ে কত দেরীতে স্কুলে ঢুকলাম, আজকে সব ট্রেন খুব লেট করছে ।" অ্যাসিস্টেন্ট হেডস্যর কিছু বলবার ঠিক আগের মূহুর্তেই ক্লাস টিচার স্যর নিজের থেকে প্রশ্ন, উত্তর স্টেটমেন্ট , জাজমেন্ট সব একত্রিত করে নিক্ষেপ করলেন। সাথেসাথে ই দরজার ওপারে সবাই এক মন্ত্র এক ধ্বনিতে গেয়ে উঠল : হ্যা স্যর ট্রেনলেট করেছে, আজকে ট্রেনলেট। বাহাদুর দা কে বলছি খুলে দিতে তবুও খুলছে না।
ক্লাসটিচার স্যর বললেন : আহা বাহাদুর দা খুলে দাও বচ্চাগুলো কে, কি যে করো তুমি। এরা মিথ্যে বলে না, সবাই ভালো ছেলে। এই শুনে বাহাদুর দা যেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে তার থেকেও ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে গেটের ওপারের ছাত্রদল।
ওদিকে অ্যাসিস্টেন্ট হেডস্যর বুঝলেন অন্তরকলন ডিএক্স/ডিটি তে মানে প্রশ্ন করবার ও রায় দানের ক্ষুদ্রতম সময়ের ব্যবধানে ক্লাস টিচারস্যর এর কাছে তিনি সম্পূর্ণ পর্যদুস্ত হয়েছেন। তেতো গলায় বাহাদুরদা কে বললেন: ঠিক আছে খুলে দাও বাহাদুর; স্যর তো বলছেনই যে ট্রেন লেট।
এই তোমরা যাও যাও সব ক্লাসে যাও , দেখো এরকম যেন আবার দেরীতে এসোনা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির রা , সব দিন তো স্যরের ট্রেন আর লেট হবে না!
প্রবাসীর দল ক্লাসে ঢুকল, ক্লাসে যেন একটা যুদ্ধজয়ের পরিস্থিতি। পিছনে পিছনে ক্লাস টিচার স্যর ঢুকলেন। সবাই সমস্বরে বলে উঠল: ধন্যবাদ স্যর।
স্যর বললেন : আস্তে সব আস্তে। আজকে হয়ত এই ভাবে বলা টা আমার ঠিক হল না তবুও কেন বললাম জানিস তোরা ?
পুরো ক্লাস জিজ্ঞেস করল: কেন স্যর।
স্যর উত্তর দিলেন: আজ তোদের ক্লাসে আমি একটা অন্য জিনিষ খুঁজে পেলাম।
সবাই তো অবাক: স্যর কি বলছেন ? আমরা কি করলাম ? কিছু বুঝছি না। করলেন তো আপনি।
স্যর হেসে উত্তর দিলেন : আমি অনেক ক্লাস পেয়েছি যেখানে অনেক ভালো ছেলে থাকে, অনেক ভালো খেলোয়াড় ভালো গায়ক বা অভিনেতা থাকে, আবার অনেক দুষ্টু ছেলেও থাকে। তোদের ক্লাসেও আছে এরকম সব ছেলে। কিন্তু একটা বিষয় আছে তোদের ক্লাসে যেটা খুবই বিরল ।
পুরো ক্লাস সমস্বরে জানতে চাইল : স্যর সেটা কি?
স্যর উচ্চকণ্ঠে বললেন : তোদের পুরো ক্লাসের একতা, মুহূর্তের ভিতর পুরো ক্লাসের এক হবার ক্ষমতা । আজকে তোদের ৬‐৭ জন বন্ধু বিপদে পড়েছে দেখে তোদের অধিনায়ক সাথে সাথে এগিয়ে এস্ছে , তোরা সেই ইস্যু কে সাথে সাথে সব্বাই এক সাথে সমর্থন করেছিস। অনেক ক্লাসেই এরকম হয়না তা না, কিন্তু তাতে কিছু সংখ্যক মতভেদ থেকেই যায়; তোদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি! কেউ বিদ্রুপ করেনি, কেউ বিপরীতমুখী ভাবেও নি। সবাই এক হয়ে এক সিদ্ধান্তে পৌছানো কিন্তু রেয়ার, তোদের ক্লাসে সেই ক্ষমতা আছে। তবে একটাই কথা বলব সব দিক আলোচনা করে, চিন্তা করে পুরো দল এক সিদ্ধান্তে আসলে সেই সিদ্ধান্ত কিন্তু যুগান্তকারী হয় !!!
বাবা ও বাবা, বাবা ওঠো না!হঠাৎ পাশ থেকে ছেলে ধাক্কা দিচ্ছে শুভ্রকে।
ছেলের ডাকে, ধাক্কায় শুভ্রর তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। । অবচেতন থেকে ফিরতে না ফিরতেই ছেলে বলল : বাবা জল তেষ্টা পেয়েছে, জল খাব । ছেলেকে জল খাইয়ে শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভাবল: সত্যি একটু আগে অবচেতনে যা দেখল সেটাই তো ওদের ক্লাসের চরিত্র।
এইতো আপৎকালে বিপদের দিনে পুরো ক্লাস ভার্চুয়াল মিডিয়ামে এক হয়ে আমফান রিলিফ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে সুন্দরবনের প্রত্যন্তে;নৌকা ভাড়া থেকে ত্রাণ বিতরণ নিজে হাতে করেছে। ভয়ংকর করোনা কালে দুদিনের মধ্যে তহবিল সংগ্রহ করে তুলে দিয়েছে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাতে।
আবার এই দলই ক্লাস ইলেভেনে প্রচন্ড দু:খে একসাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্কুলে সরস্বতী পূজো না করবার । যেখানে এই সরস্বতী পূজো এক একটা ক্লাসের স্মৃতির সারণী হয়ে থাকে সেইখানে এই ব্যাচ সবাই একসাথে নিজদের আনন্দ থেকে দুরে সরে নীলকণ্ঠের মতন গরল কেও গ্রহণ করেছে মিলেমিশে।
না, এরা কখনোই কেউ দূরে সরে যেতে পারেনা, কেউ কাউকে ভূলতে পারেনা। অসম্ভব সেটা।
শুভ্র মোবাইল থেকে একটা ম্যসেজ পাঠাল "আমি আসছি স্কুলের রিইউনিয়নে: ১৮ বছর পরে "।
চার দিন পর :
আজ রাতে শুভ্র ছেলেকে ঘুমের আগে গল্প করতে বসেছে। ছেলে জিজ্ঞাসা করছে: বাবা বাবা তোমাদের সবার গায়ে এক জামা কেন?
বাবা হেসে উত্তর দিল : তোর যেমন বন্ধু আছে স্কুলে এরাও আমার স্কুলের বন্ধু , তোরা স্কুলে যেমন সবাই এক ড্রেস পরিস আমরাও আজকে দুপুরে সবাই এক ড্রেস পরেছি।
ছেলে: তাহলে কি তোমরা সবাই ক্লাসফ্রেন্ড?
বাবা: হ্যা রে আমরা সবাই ক্লাসফ্রেন্ড।
ছেলে: তোমরা টিফিন শেয়ার করে খাও?
বাবা হেসে বলল: হ্যা আজকে আমরা সবাই এক টিফিনই খেয়েছি, শেয়ার করেই খেয়েছি।
ছেলে : বাবা তুমি কত দিন পরে স্কুলে গেলে, আমি আগে কোনোদিন তোমাকে স্কুল যেতে দেখিনি তো? তোমার বন্ধুরা তোমাকে মিস করেনি? আমার তো কালকে গরমের ছুটির শেষে স্কুল খুলছে, আমার বন্ধু রা আমাকে মিস করেছে খুব।
বাবা সজল চোখে বলল: হ্যা বাবা, আমার সব বন্ধু সবাই সবাই কে মিস করেছে । আমাদের গরমের ছুটিটা একটু বেশী হয়েছে ১৮ বছর।
তুই চিন্তা করিস না, কালকে তুই যখন স্কুলে ঢুকবি দেখবি এই গরমের ছুটির কথা তোর মনেই থাকবে না । আজকে দেখা হবার পর আমার সব বন্ধু দেরও আর মনে হয়নি আমরা ১৮ বছর পরে দেখা করছি। শুধু মনে হয়েছে ১৮ দিনের স্কুল ছুটি কাটিয়ে একটু বড় হয়ে আমরা সেই ক্লাসরুমে ফিরে গেছি।
ছেলে বাবার নতুন স্কুল ড্রেস টা দেখছে, কিছু একটা লেখা আছে। আস্তে আস্তে পড়ল : "দলছুট"
বাবা "দলছুট" কি?
বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বলল : এখন বুঝবি না । তবে বড় হয়ে গেলে একদিন দেখবি দলছুট আমরা সবাই। কিন্তু ,দলে ফেরার ভাগ্য সবার হয় না,সেই সুযোগ অনেকেই পায়না।
আমি কালকে সেই দলটা কে আবার ফিরে পেয়েছি, দলে ফিরে গেছি।
ছেলে পরম আদরে বাবার জামা টা বুকে জড়িয়ে ধরল।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন