পদ্মা আমার মা
"কি বলছিস? এটা কি সম্ভব! ঐ ভয়ংকর নদীতে সেতু হবে কি ভাবে? এপার ওপার দেখা যায়না রে সোনাই।" বিস্ময়ের সাথে পুত্র সোনাই কে বলল রাণী দেবী ।
সোনাই মুচকি হেসে বলছে : মা এমন ভাবে বলছ যেন সমুদ্রের উপর সেতু হচ্ছে! ওতো একটা নদী ছাড়া আর কিছুই না। আজকাল আটলান্টিক এর উপর নরওয়ে তে ব্রীজ আছে, আমাদের ব্রহ্মপুত্র নদ এর উপর বিশাল ব্রীজ হয়েছে,চীনে কি বিশাল বিশাল সব বাঁধ হয়েছে, আরে আমাদের গঙ্গার তলায় মেট্রো হয়েছে। পদ্মায় ব্রীজ তৈরীকরা আর এমন কি ব্যাপার তাহলে।
মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল : আমি তো ব্রহ্মপুত্র বা আটলান্টিক দেখিনি সোনাই কিন্তু সেই ভয়ংকর উত্তাল পদ্মা দেখেছি। উফফ কি ভয়ঙ্কর সেই রাত ভাবলেও এখনো বুক কেপে ওঠে আমার!
সোনাই মায়ের মুখে এক ফ্যাকাশে আতঙ্কের ছবি দেখতে পায়। আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছিল মা , এ ভাবে মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে কেন তোমার ? পদ্মার কথা শুনে।
মা বললেন শোন তাহলে বলছি:
আমার বয়স তখন ৭ কি ৮। এপারে তখনো পুরোপুরি আসিনি আমরা।আমার বাবা দেশভাগের পরে কলকাতায় একটা বাড়ি কিনে রেখেছে। সেখানে তোর বড় মাসি আর বড় মামা কে নিয়ে দাদু থাকত। মা মেজদি, ছোটভাই আর আমাকে নিয়ে বাকি জ্ঞাতি দের সাথে থাকত দেশের বাড়ি ফরিদপুরে। স্কুলে ছুটি পড়লে দিদি দাদা কে নিয়ে ওপারে চলে যেত বাবা। সারা বাড়িতে তখন হৈ হৈ পড়ে যেত। আমাদের দেশের বাড়িতে আমরা ছাড়াও জ্যঠামশাই, কাকার পরিবার তৎসহ আরো সব জ্ঞাতিগুষ্টি এক সাথে, সে যে কি আনন্দ করতাম রে সোনাই তোকে কি বলব! আম, কাঁঠাল এর আলাদা বাগান পুকুর বিল দাপিয়ে বেড়াতাম আমরা সবাই। সে এক অন্য জন্মের কথা মনে হয় রে এখন!
সোনাই চোখ গোল গোল করে বলল মা তুমি সাঁতার জান? আমার তো বিশ বছর হয়ে গেল এখনো জানি না!
মা হেসে বলল ওরে আমি তিন রকমের সাঁতার জানতাম। বিশাল নদী তে নেমে পড়তাম, ভেসে বেড়াতাম অনেক্ষণ। আমরা সেটাকে বলতাম গাঙ। তোকে সাঁতার টাই শেখাতে পারলাম না। আসলে আমাদের জ্ঞাতি ভাইবোন রা এক সাথে থাকতাম দল বেধে, এক জন আরেক জন কে শিখিয়ে দিতাম সাঁতার থেকে শুরু করে গাছে চড়া, জানিস আমি নারকেল গাছে উঠে যেতাম তোদের মামা দের সাথে। কি দস্যি ছিলাম এখন ভাবি।
সোনাই হেসে বলল : ঐ জন্যেই এখন হাঁটুর ব্যথায় কষ্ট পাও। যাকগে এইখানে পদ্মায় বিভীষিকা টা কোথায়?
মা ঢোক গিলে বলল : বলছি দাড়া। আমাদের বাড়ি ছিল ফরিদপুর এর বেশ ভেতরে এক গ্রামে। তখনো সেরকম পাকা রাস্তা কিছু হয়টয়নি,যোগাযোগ বলতে নৌকাপথ।তবে এখন শুনেছি সব সুন্দর রাস্তা হয়ে গেছে। তা যাই হোক, একবার বাবা কলকাতা থেকে এসেছে বাড়িতে, সেই বার দাদা দিদি আসেনি সাথে। বাবা বলল বাবার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের নিমন্ত্রণে যেতে হবে কিন্তু সেটা নোয়াখালিতে, দেশের দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে পদ্মা মেঘনা পার হয়ে।
"পদ্মা মেঘনা পার" হতে হবে শুনে বেশ রোমাঞ্চ জাগল, ছোটবেলা থেকে তেমন গ্রামের বাইরে আমি যাইনি। দাদা-দিদি-বাবা র গল্পে আর বইয়ের পাতায় একটা বাইরের দুনিয়া আছে সেই ধরণাটাই শুধু হয়েছে। আর বাড়িতে বড়দের আলোচনা করতে শুনেছি পদ্মার নাকি একূল ওকূল দেখা যায়না, ভয়ংকর অশান্ত নদী । এই নদী পারাপার একটা বিশাল ব্যাপার।
তাই বাবার মুখে নোয়াখালি যাবার কথা শুনেই নাছোড় বায়না ধরলাম ; বাবা যাব ,বাবা যাব বলে। তোর মেজ মাসি আর ছোট মামা তেমন উৎসাহ দেখাল না। মা ও বলল : যেতে হবে না তোকে। তোর মেজদিদি, ভাই যাচ্ছেনা তোর যাবার কি হলো?
কিন্তু আমি যাবই যাব। অনেক কান্নাকাটি, রাগ অভিমান শেষে বাবা রাজি হল। দুদিন পর দুপুর বেলা প্রতিক্ষিত যাত্রা শুরু হল আমাদের পিতা কন্যার।
তখন বৈশাখ এর শেষ।আমাদের যাত্রা শুরু হল নৌকা তে, আমার তো বেশ মজা লাগছে। যে গাঙে ভেসে বেড়াই তাতে নৌকা করে যাচ্ছি। বাবা কে জিজ্ঞেস করলাম: বাবা এই নৌকা করেই আমরা পুরোটা যাব তো?
বাবা হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল : না রে খুকী। এই নৌকায় আমরা গাঙ ধরে প্রথমে গঞ্জে যাব। সেইখানে আছে লঞ্চঘাট। লঞ্চে করে পদ্মা মেঘনা পার হব । এই নৌকায় পদ্মা পারাপার অসম্ভব।
বাবা আমরা লঞ্চে উঠব!!!!!! বাবা হাসি হাসি মুখে বলল হ্যা উঠবতো।
সে কি এক বিস্ময়,উত্তেজনা! আমি ছোট বেলা থেকে গ্রামের মধ্যে নৌকা, গরুর গাড়ি সাইকেল এর বাইরে আর তেমন তো কোনো যানবাহন দেখিনি। তাই আরেকটা নতুন উত্তেজনা মনে।
লঞ্চ ঘাটে এসে আমি তো অবাক। পুরো অপু দূর্গার মতন অব্স্থা আমার। প্রথমবার চোখের সামনে এত বড় মানে নৌকার থেকেও কত্তবড় সব জলযান। আমি হা করে দেখছি। ইতিমধ্যে বাবা টিকিট কেটে এনেছে। আমাদের লঞ্চ পড়ন্ত বিকেলে রওনা দিল। আমি তো খুব উত্তেজিত । লঞ্চ যখন একটু পরে বাঁক খেয়ে প্রবল পদ্মায় ঢুকল সবে সন্ধ্যার ছোয়া লেগেছে দিকচক্রবালে।
তোকে কি বলব রে সোনাই!!! আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সন্ধ্যার অল্প আলোতেই দেখলাম আকাশ বাতাস মাটি বলে যেন কিচ্ছুটি নেই সামনে। শুধু জল আর জল। বাবা কানেকানে বলল খুকী আমরা পদ্মায় ঢুকছি। আস্তে আস্তে লঞ্চ টা একটু বেশী দুলতে শুরু করল। যাই হোক এরপর অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে লঞ্চের ভিতরে গিয়ে বসলাম। লঞ্চ দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল দুরন্ত পর্দায়। আমিও আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়লাম বাবার কোলে, লঞ্চের দুলুনিতে।
হঠাৎ ঘন্টা খানেক পরেই এক প্রবল দুলুনিতে আমার ঘুম গেল ভেঙ্গে। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা কেমন ভয় পেয়ে গেছে, চারদিকে লোকজন প্রচন্ড চিতকার করছে। আমি বেশ ঘাবড়ে গেছি, ভয়ে ভয়ে বাবা কে জিজ্ঞেস করলাম বাবা কি হয়েছে?
বাবা আস্তে বলল খুকী পদ্মায় ঝড় উঠছে। বাবার কথা শেষ হতে না হতেই প্রচন্ড হাওয়া আছড়ে পড়ল লঞ্চের গায়ে!!
আমি ভয়ে চেচিয়ে উঠলাম , কেঁদে দিলাম । চারদিকে প্রচন্ড ভয়, চিতকার । লঞ্চের চালক দৌড়ে এসে বলল : আপনারা লঞ্চের সব জানালা খুলে দিন, খুলে দিন ! মাঝপদ্মায় এই ঝড় ভয়ংকর। কেউ জানলা বন্ধ রাখবেন না। হাওয়া লঞ্চের ভেতর দিয়ে বয়ে যেতে দিন না হলে লঞ্চ পাল্টি খাবে। আর নিজদের শক্ত করে ধরে রাখবেন।
সবাই জানালা খুলতে শুরু করল । জানলা খোলার সাথে সাথেই শত-সহস্ত্র নাগিনী যেন আছড়ে পড়ল দুই দিক থেকে। আমি বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি । বাবা কানের কাছে অসহায়ের মতন বলল যা হয়ে যাক খুকু তুই আমার চুল ধরে রাখবি। চুল ছিঁড়ে গেলেও তুই ছাড়বি না আমাকে, আমি আছি তোর সাথে, কিচ্ছু হবেনা মা, আমাকে ধরে থাকবি।
বাবার আর্তনাদে আমি ভাবলাম আমি যে সাঁতার জানি তবুও বাবা কেন এই কথা বলল, তারমানে এ এক ভয়ংকর নদী।
চারদিকে তখন বিলাপ, চিতকার আর ইষ্টনাম স্মরণ হচ্ছে। কেউ ডাকছে "হে নারায়ণ , হে মধুসূদন রক্ষা কর" ; কেউ বলছে "হায় আল্লা" কেউ স্মরণ করছে মা কালী, মা দুর্গা কে। ভয়ংকর মুহূর্তগুলো যেন এক এক বছরের মতন পারহচ্ছে।
এইভাবে কতক্ষণ কাটল জানিনা।
লঞ্চের চালক বেশ কিছু সময় পরে এসে বলল আপনারা এইবার শান্ত হোন, আমরা পদ্মা পার করে মেঘনায় ঢুকছি। ঝড়ও কমে গেছে; আস্তে আস্তে বাইরের তাণ্ডব লয় পেতে শুরু করল।
বাবা আমাকে জাপটে ধরে অশ্রুসিক্ত চোখে বলল আমরা বেঁচে গেছিরে খুকী আর ভয় নেই, বেঁচে গেছি আমরা। আমি বাবা কে খুশীতে জড়িয়ে ধরলাম।
সোনাই মন্ত্রমুগ্ধতার সাথে বলল: তারপর মা? তারপর কি হোলো?
মা হেসে বলল: তারপর আর কি আমরা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গেলাম ।
তবে জানিসতো সেদিনের এই ঘটনায় কে আমাদের বাঁচিয়েছিল এখনো আমি ভেবে পাইনি: সে কি আল্লা ছিল, ভগবান ছিল, নারায়ণ-মা কালী ছিল নাকি লঞ্চ চালকের অভিজ্ঞতা- পদ্মা কূলের মাঝি!!
মাঝে মাঝে এটাও মনে হয় এক পিতার নিজ সন্তান কে রক্ষার আকূল আর্তি শুনে মা পদ্মা নিজেই আমাদের রক্ষা করেছিল সেদিন ।
টিভিতে দেখাচ্ছে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি চলছে আর নীচে প্রবলবেগে পদ্মা প্রবহমান।
সোনাইর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সেই দৃশ্যপটে।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।
sishur chokhe padma,apurba.
উত্তরমুছুন