২৩ এর লেসার ইভিল।।

"২৩ এর লেসার ইভিল" কে বলতো মোহন? মোহন বিরক্ত হয়ে বলল উফফ তুই আবার ঘুরেফিরে সেই এক বিষয়ে ঢুকছিস পলাশ, এই বিষয়ে কোনো কথাই বলব না। কলেজে দেখলি তো এই ব্যাপার গুলো নিয়ে কিভাবে ঝামেলা হচ্ছে। রাস্তাঘাটে এই সব করিস না। মোহন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসলো । পলাশ মোহন দুই বন্ধুই বিজ্ঞান শাখার ছাত্র,  প্রতিদিন একসাথেই চন্দননগর থেকে কলকাতায় যাতায়াত করে তাই ট্রেনে বাসে অনেকটা সময় গল্প করেই কাটিয়ে দেয় ।

পলাশ বলে : আরে ভাই এটা অন্য প্রেক্ষিতে বলছি।
মোহন বলে ওঠে : আর আমার প্রেক্ষিত শুনে কাজ নেই। সেই তো ঘুরে ফিরে "সুনার বাংলা", "বহিরাগত" এই গুলোতেই ঠেকবে।
পলাশ সম্মতির সাথে বলে:  অবশ্যই এই শব্দ গুলোই আসবে কিন্তু সময় টা আজকের হিসেবে না! মোহন মুখ ভেংচে বলল হ্যা আজকের কেন হবে ? বলেই তো দিলি ২৩ এর; মানে সামনের বছরের।
পলাশ বলল সব সময় সামনেই দেখবি ভাই? মাঝে মাঝে একটু পিছন পানে তাকিয়ে দেখ- পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।
মোহন বলল না ভাই ক্ষমা কর, তোর পেছনে  ফিরে দেখা মানেই সেই আগের বছর এর ইস্যু কে কি করেছে, করেনি আমার আর দরকার নেই জেনে।পলাশ মিটিমিটি হেসে বলল গুটিগুটি পায়ে আরেকটু পিছিয়ে এস বৎস। আরেকটু মানে এই ২৬০ বছর আর কি!!

মোহন চোখ বড় বড় করে বিস্মিত হয়ে বলল : মানে! ২৬০ বছর আগেও তুই বলছিস বহিরাগত, সুনার বাংলা , লেসার ইভিল সব ছিল?
পলাশ উৎসাহিত হয়ে বলল সব ছিল রে, শুধু এক দুর্ভাগার কোনো আদুরে পিসি ছিল না, হিংশুটে এক মাসি ছিল!
মোহন অবাক হয়ে বলল: সে কিরে ভাই! এই গল্প তো শুনতেই হবে।

সব বলছি শোন, তবে তার আগে দুটো গরম গরম দিলখুশ দিয়ে মন কে খুশ কর । মোহন বুঝল ভালো কিছু গল্প সামনের এক ঘন্টায় শুনতে পাবে, তাই বিনা বাক্যব্যয়ে গরম দিলখুশ কিনে তুলে দিল পলাশের হাতে। পলাশ এক কামড় দিয়ে শুরু করল :

আজ থেকে ২৬০-৬৫ বছর আগে বাংলার মাটিতে এক অতভুৎ পরিস্থিতি ছিল। একদিকে বাংলার শাসক আলিবর্দি সবে মারা গেছেন, তিনি তার দৌহিত্র সিরাজ কে বাংলার নবাব পদে আসীন করেছেন। যদিও আরেক দৌহিত্র শওকত জঙ্গ মুঘল দরবারে তদ্বির করে নিজের নামে বাদশার অনুমতি পেয়েছিল বঙ্গ শাসনের, কিন্তু সিরাজ তাকে যুদ্ধে পরাজিত করে একক অধিকারে নিয়ে আসে বাংলা কে।
কিন্তু সিরাজ এর ঘরে বাইরে কেউ চায়নি সিরাজ নবাব থাকুক। তাই একএক জন নিজের স্বার্থ দেখে এক মহাজোট তৈরি করে ।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ভাবলেন বীর মরাঠা শিবাজী র মতন এক হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবেন দেশের পূর্ব প্রান্ত থেকে, ধন কুবের জ্গৎ শেঠ ভাবলেন তিনি হবেন কৃষ্ণচন্দ্রের মন্ত্রী।

মীরজাফর ,প্রধান সেনাপতি তাকে নবাব হবার টোপ দিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র দলে টানলেন। মীরজাফর এর চোখে সুবা বাংলা বিহার উড়িষ্যা র নবাব পদের লালসা চক চক করে উঠল।

ইংরেজ দের কারবারি উমিচাঁদ চাইলেন উজির হতে, কিন্তু সেটা সম্ভব ছিল ইয়ারলতিফ নবাব হলেই। ইয়ার লতিফ ছিল সিরাজ এর  আরএক সেনাপতি;
ইয়ারলতিফ ভাবলেন আমার ক্ষমতা অসীম, আমি কেন নবাব হব না ? তাই ইয়ার লতিফও জোট এ যুক্ত হলেন।

অন্য দিকে ঢাকার রাজা রাজবল্লভের উপর সিরাজ ছিল অত্যন্ত রুষ্ট। তাই রাজবল্লভ ও ভাবলেন সিরাজ কে উত্খাত করলেই আমি বাঁচব, তিনি আবার আরেক নবাব সেনাপতি রায়দুর্লভ কে দলে ভিড়িয়ে আনলেন।
সিরাজ এর মাসি ঘ্সেটি বেগম সিরাজ কে সহ্য করতে পারতেন না। তিনিও জড়িয়ে পড়লেন এই জোটে।

পলাশ একটানা বলে একটু থামল। ও দেখল করল শুধু মোহন না কামরায উপস্থিত অরো যাত্রী রাও তন্ময় হয়ে শুনছে। দিলখুশ কাকু ও বিক্রি বন্ধ করে উবু হয়ে বসে ওর কথা শুনছে।
মোহন  বলল :  আরে ভাই তুই বললি যে লেসার ইভিল, বহিরাগত আছে; কোথায় কি? এতো সেই রাজা, নবাব এই নিয়েই গল্প চলছে পরিবার পরিষদ বর্গের মধ্যেই।

পলাশ একটু থেমে বলল : ঘরের লোক না বিগড়ালে বাইরের লোক ঢুকবে কি ভাবে? উপরে যা বললাম সবই ঘোট হচ্ছিল কিন্তু দানা বাধছিল না কিছুতেই। একটা উদ্যম, একটা জোশ শক্তি সেইটা  মিসিং ছিল।

পলাশ বলতে থাকল:
সেই যায়গায় উমিচাঁদ, কৃষ্ণচন্দ্র আর রাজবল্লভ সবাই কে বোঝাল এই উদ্যম ও পরিকল্পনায় উন্নত শক্তি হিসেবে একমাত্র অবলম্বন হতে পারে ইংরেজ রা। আর ইংরেজ রাও সিরাজ এর উপর ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। ওদের কলকাতার দুর্গ ভেঙ্গে দিয়েছে সিরাজ । তাই ওরাও প্রতিশোধ নিতে চাইছে তবে ওরা নিজেরা জড়াতে চাইছে না। নিজেরাই নিজদের বহিরগত হিসেবে ভেবে দুরে থেকে সাহায্য করতে চাইছে আমাদের।

দু এক জন বলল এতদিন রাজনীতি শাসন সবই তো হিন্দু, মুসলমান, পার্সি এদের মধ্যেই ঘুরছিল; এই সাগরপারের বেনের দল কে তো বিশ্বাস করা যায় না। এমনিতেই কর বিহীন বানিজ্য করতে চায় এরা।
উমিচাঁদ তাদের বোঝাল সিরাজ থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাব। এরা সিরাজ এর থেকে তো কম ক্ষতিকর আমাদের জন্য। এদের সাহায্য না পেলে আমরা কিছুই করতে পারব না। আর ভেবে দেখো; এরা তো করবে ব্যবসা বানিজ্য । শুধু শুধু ভয় পেয়ে লাভ নেই। রাজদন্ড আমাদের হতেই থাকবে।  বণিক তার মানদণ্ড নিয়ে খুশী থাকবে। অবাধ বানিজ্য করতে পারবে এতেই ওরা খুশী থাকবে বুঝলে।  সিরাজ কে তো আমাদের যেভাবেই হোক সরাতেই হবে। ইংরেজ দের আনতেই হবে এই জোটে।
এই ভাবেই লেসার ইভিল হিসেবে মান্যতা পেয়ে ইংরেজ রা জোটে ঢুকল সবার শেষে।

মোহন বলল : বুঝলাম তো সবই কিন্তু ২৩ এর ব্যাপার টা বোধগম্য হল না রে।
পলাশ হেসে বলল : আরে ২৩ শে জুন ১৭৫৭ তেই তো সেই পুতুল যুদ্ধ টা হয় । সিরাজ তো হেরে গেল কিন্তু লেসার ইভিল ইংরেজ দণ্ডমুণ্ড এর কর্তা হয়ে বসল।
মোহন অবাক হয়ে বলল: বাকি রা মেনে নিল সেই সব?
পলাশ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল ইভিল সব সময়ে ইভিলই থাকে। ইংরেজ রা সবাই কে সরিয়ে দিয়েছিল দুনিয়া থেকে আর যারা ইংরেজ আনুগত্য পুরোদমে মেনে নিয়েছিল তাদের ছেড়ে দিয়েছিল।

তবে অতভুৎ ব্যাপার কি জানিস ২৩ শে জুন পলাশীর যুদ্ধের যারা নায়ক খলনায়ক কুশীলব তাদের কেউই স্বাভাবিক মৃত্যু পায়নি!! ইতিহাসের এ এক সত্যি বিস্ময়কর ঘটনা। এক জন

মোহন বিস্মিত হয়ে বলল : কি বলছিস রে!

পলাশ বলতে থাকল : হ্যা, সিরাজ  যুদ্ধের দুদিন পরে ধরা পরে; মিরজাফর এর ছেলে মীরন এর নির্দেশে নিহত হয় । মিরজাফর শেষ জীবনে কুষ্ঠ হয় হাতে; যে হাত দিয়ে কুরান শরীফ ছুয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সিরাজ এর পাশে থাকার। রায়দুর্লভ ও জ্গৎ শেঠ কে বক্সার এর যুদ্ধের আগে মিরকাশিম গলায় বস্তা দিয়ে নদীতে ডুবিয়ে মারে। উমিচাঁদ কে ইংরেজ রা সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে , তাকে যুদ্ধের আগে জাল এক লাল দলিলে ভূয়ো আশ্বাস দেয় বিপুল সম্পদের,  কিন্তু যুদ্ধ শেষে সেনাপতি ক্লাইভ বলে দেয় তার দলিল টি জাল সুতরাং তিনি কানাকড়িও পাবেন না; এই শোকে উমিচাঁদ পাগল হয়ে যায়।
ঘ্সেটি বেগম কে মীরণ পদ্মা নদী তে ডুবিয়ে মারে। মীরণ নিজেও অকালে বজ্রস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। রাজ বল্লভের ও অপমৃত্যু ঘটে। ইয়ার লতিফ কে পলাশীর যুদ্ধের পরে আর খুজে পাওয়া যায়নি, আনুমান করা হয় হয়তো তাকে গুম খুন করা হয়েছিল।
ইংরেজ পক্ষেও সেই এক দৃশ্য : স্ক্রফটন যে পলাশীর যুদ্ধের পর সিরাজ এর বিশাল সম্পদ হস্তগত করে সে এদেশ থেকে বিলেত যাবার সময় জাহাজ ডুবিতে ঐ সম্পদ সহ অতল সমুদ্রে চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

ওয়াটসন পলাশীর যুদ্ধের পর পরই হঠাৎ শরীর খারাপ হয়ে কলকাতায় মারা যায়।
ওয়াটস যে মিরজাফর এর সাথে ইংরেজ দের ষড়যন্ত্রে র চুক্তি স্বাক্ষর করে সে সেই ইংরেজ দের কাছ থেকেই অপমানিত ও পদ থেকে অপসৃত হয়ে মনোকষ্টে হঠাৎ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা যায়।

পাশে বসা এক যাত্রী বিস্ময়ের সাথে বলে ওঠে এ কি আশ্চর্য ব্যাপার! এরকম ও হয় নাকি? আচ্ছা তাহলে ঐ ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ এর কি হল? ওর সম্পর্কে তো কিছু বললে না তুমি ভাই।

পলাশ শান্ত ভাবে বলল:  ক্লাইভ যখন দেশে ফেরে ৩০ জাহাজ ভর্তি ধনরত্ন সাথে, কিন্তু ফিরেই ইংরেজ আইনে প্রশ্নের সম্মুখীন হয় । যে ইংরেজ প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা পেল ক্লাইভের জন্য সেই ক্লাইভ এর ফাঁসির হুকুম হয়  : হিসাব বহির্ভুত সম্পত্তি, উমিচাঁদ কে ছলনা, ব্যভিচার ও অন্য অন্যায়ের কারণে । বিচারের নামে এই শাস্তি, এই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে অপমানে ক্লাইভ আত্মঘাতী হয়।
ইংরেজরা আত্মশ্লাঘা অনুভব করল  যে অন্যায় এর কোনো ক্ষমা নেই তাদের আইনে।
মোহন সব শুনে উদাস ভাবে বলে উঠল : যারা পলাশী যুদ্ধের কুশীলব তাদের সবারই অন্তিম কাল এক হৃদয় বিদারক করুণ কাহিনী।

পলাশ স্মিত হেসে বলল : বুঝলি তো মোহন; আসল ইভিল হল সেই লোভ, সেই লালসা যে দাবার ছকে রাজনীতির ঘোড়ায় চেপে ঢুকবে; শুধু দখল আর দখল করতে করতে এগোবে। কিন্তু পরিস্থিতি এলে লাভের জন্য নিজের মন্ত্রী কেও গিলে নিতে পিছপা হবে না লোভের রাজনীতি। রাজনীতি থেকে লোভ সরে গেলে দেখবি কেউ ইভিল নয় , কোনো দলই ইভিল হতে পারে না। কারণ লোভ সরে গেলে শুধু সেবাই পরে থাকবে রাজনীতি তে। যত মত হোক যত দল হোক পথ একটাই থাকবে : জনসেবা।

ট্রেন ধীর গতিতে প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। সহযাত্রীরা সব  নীরবে চিন্তামগ্ন। দুই বন্ধু ধীরে ধীরে ট্রেন থেকে নেমে গেল; গন্তব্য এসে গেছে।।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"