দ্রোণ পর্বে সূর্যাস্ত আইন। একুশ মাঝে মিশে গেল ফাইন ।।

দ্রোণ পর্বে সূর্যাস্ত আইন।
একুশ মাঝে মিশে গেল ফাইন ।।

"আজকেও বিকেলের মধ্যে কাজ শেষ হল না তোর? কোনোদিনই তো সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারিস না, কূর্ম অবতার তুই একটা। বইগুলো এখনও বাধিয়ে উঠতে পারলি না সময়ের মধ্যে? জানিস না প্রতিদিন সন্ধ্যেসন্ধ্যে ডেলিভারি দিতে হয়। কি যে টুকুর টুকুর করিস।
দাড়া, তোর ব্যবস্থা করছি আমি।" - কথাটা বলেই রণেন চৌধুরী নিজের টেবিলে ঘ্যাট হয়ে বসল।
বসেই আবার হাঁক পাড়ল : এই বিশু যা দুটো চা বলে দে সামনের দোকানে। সিদ্ধার্থ বাবু আপনি চা খাবেন তো?
সিদ্ধার্থ বাবু সম্মতি জানাল। বিশু মুখ কালি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল চা আনতে।

ওর ভাগ্যে চা নেই! কোনোদিনই চা থাকেনা  ওর বরাতে,কিন্ত ওকেই বয়ে বয়ে আনতে হয়।
রণেন চৌধুরী এই বই বাধাই দোকানের মালিক । প্রায় ৩০ বছর হয়ে গেল এই দোকানে।  কলেজ স্ট্রিট এর অনেক দোকানদার,ক্রেতা , পাঠাগার  তার কাস্টমার ; বিশেষ করে পুরনো বই বাধাই এর অর্ডার আসে দোকানে। আশেপাশে আরো দুটো দোকান থাকলেও এই মাস ছয় সাতেক হলো হঠাৎ যেন লক্ষীর পদধূলি তে ধন্য হয়েছে দোকান। অর্ডার বহুগুণ বেড়ে গেছে। দোকান এর সব সময়ের কর্মচারী সিদ্ধার্থ বাবু একা সামলে উঠতে পারছিলেন না, তাই বিশু কে রেখেছেন কাজে। ভালো নাম বিশ্বনাথ মন্ডল, থাকে বারুইপুরের দিকে, অষ্টম শ্রেণী অব্ধি পড়েছে তারপর কাজে ঢুকেছে এখন উঠতি যুবা।

বিশু চা আনতে বেরিয়ে গেলে রণেন চৌধুরী মনে মনে ভাবতে লাগলেন : অল্প পয়সায় পেয়েছি ছেলেটাকে কিন্তু কাজে কম্মে তেমন পটু নয় । একটু গম্ভীর হয়েই  সিদ্ধার্থ বাবু কে জিজ্ঞেস করলেন : আচ্ছা এই বিশুটা কে দিয়ে তো কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এটাকে বিদায় করি ভাবছি। কি বলেন আপনি?
সিদ্ধার্থ বাবু নীচু স্বরে উত্তর দিলেন : আপনি মালিক আপনিই ঠিক করবেন কি করণীয়। তবে  ও কিন্তু কাজ প্রায় সেরেই এনেছে ।
বিরক্তি নিয়ে রণেন বাবু বললেন : ধূর ধূর কি বলেন, প্রতিদিনই দেখি সন্ধ্যের পরে ওর কাজ নামে। এদিকে আমার ডেলিভারির কথা থাকে ঠিক সন্ধ্যে হলেই। এই ভাবে তো চলতে পারেনা, প্রতিদিন লাইন দিয়ে কাস্টমার রা বসে থাকে, আর কথা শোনায়। না না আমি আজকেই ওকে বিদেয় করব। আর নয় । আসুক চা টা নিয়ে।

সিদ্ধার্থ বাবু একটু চুপ করে বললেন:  ওক একটা সুযোগ তো দিন । দেখুন কালকে সন্ধ্যের আগে ও শেষ করতে পারে কিনা? একটা সুযোগ তো সবারই প্রাপ্য। তা দেখুন আপনি মালিক আপনি বুঝবেন।

রণেন বাবু একটু ভেবে বললেন আচ্ছা তাই হোক । কালকে সন্ধ্যের মধ্যে কাজ না নামলে ওর নাম ঘ্যাচাং ফু হয়ে যাবে। বলতে বলতেই বিশু ঢুকল দুই হাতে দুই কাপ চা নিয়ে।
রণেন বাবু কে চা দেওয়ার পরেই কথাটা পাড়লেন: শোন বিশু তুই খুব ধীরে ধীরে কাজ করিস। তোর কাজ শেষ হতে হতে দেরী হয় , কাস্টমার কে অপেক্ষা করতে হয় । তাই আমি ভাবছিলাম তোকে আজকেই বিদেয় করব , কিন্তু সিদ্ধার্থ বাবুর অনুরোধে তোকে আরেকটা সুযোগ দিচ্ছি। কাল যদি সন্ধ্যের আগে  মানে সূর্য ডোবার আগে কাজ শেষ করিস বেঁচে যাবি, না হোলে তোকে কালকেই বিদেয় করব। দেখ পারিস কিনা নিজের কাজ বাঁচাতে?

বিশু এই বজ্র নির্ঘোষ শুনে শঙ্কিত , ও নিজেও বোঝে ও  শীঘ্র কাজ শেষ করতে পারেনা।
ও কোনো বই বাধাই করতে গেলে অন্তত বোঝার চেষ্টা করে কিসের বই , ভূমিকা পড়ে বিষয়বস্তুর সারবত্তা বোঝে, দরকারে সিদ্ধার্থবাবু কে জিজ্ঞেস করে এই বই এর বিষয়বস্তুর ব্যপারে।
সেই অনুসারে পছন্দ মাফিক ছবি দেয় ; সেই আনুপাতিক একটা সুন্দর প্রচ্ছদ দেয় । এই তো সেদিন এককপি ছেঁড়া আরণ্যক এর বইবাধাই করতে গিয়ে ভূমিকা পড়ে বুঝল এটা বনজঙ্গল এর উপর বই কিন্তু বন জঙ্গল টা লাল মাটির দেশের। নিজের মন থেকে একটা শাল পিয়াল বনের ছবি দিয়ে মুড়েদিল বই টা। বর্ডার দিল লালচে বাদামী রঙ দিয়ে। পেছনে কালচে সবুজ রঙ এর ব্যাক কভার দিল। এই ভাবেই তো ও কাজ টা করে। কাজ টা র প্রতি অন্যায় করতে পারেনা।  যাই হোক এখন দ্বিধায় পড়ে গেল রণেন বাবুর কথা শুনে; হ্যা না কি বলবে ভাবছে চুপ করে ।

রণেন চৌধুরী বিশুর দিকে তাকিয়ে বেশ একটা রগরগে মজা পেলেন,
বিষয় টা কে নিয়ে একটু খেলতে চাইল তার মন। একটু টেনে টেনে বললেন: আচ্ছা এত ভাবছিস, তাহলে ঠিক আছে আরেকটু উপভোগ্য করি ব্যাপার টা। তুই কালকে সন্ধ্যের আগে কাজ সেরে দিবি , আমি নিজের থেকে আর তাড়াব না তোকে। আমাদের সাথে তুই ও প্রতিদিন বিকেলে চা পাবি  এক কাপ করে। হে হে কিরে এইবারতো বল কিছু।

বিশু কিছু বলার আগেই সিদ্ধার্থ বাবু বললেন আর তো উপায় নেই তাই ওকে এই "সূর্যাস্ত আইন" মানতেই হবে। হ্যা আপনি তাই করবেন রণেন বাবু।
রণেন বাবু অবাক গোল গোল চোখ করে  বললেন: মশাই, সূর্যাস্ত আইন টা কি বস্তু?
সিদ্ধার্থ বাবু বললেন কিরে বিশু জানিস তো সূর্যাস্ত আইন টা কি? জানলে বলে দে।
বিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সিদ্ধার্থ বাবুর দিকে , আসতে আসতে বলতে শুরু করল :
ইংরেজ আমলে ১৭৯৩ সালে "চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত" এর মধ্যে একটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল জমিদার কে বছরের শেষে একটি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্ত এর পূর্বে  রাজস্ব জমা দিতে হবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘরে, সূর্যাস্ত হয়ে গেলে অনাদায়ী রাজস্বের কারণে সেই জমিদার তার সব সম্পত্তি হারাবে।
রণেন বাবু একটু অবাক হয়ে  বলল:   তুই এত সব জানলি কি ভাবে রে?
যাই হোক ঠিক আছে তাহলে ঐ কথাই রইলো, আজ আমি আসছি আর কালকের মধ্যে  মহাভারতে দ্রোণ পর্বের বাধাই টা যেন হয়ে যায়। না হলে তোর উপরেই বলবৎ হবে ঐ সূর্যাস্ত আইন।

রণেন বাবু বেরিয়ে যেতেই বিশু অবাক হয়ে বলল: সিদ্ধার্থ দা আপনি হ্যা তো বলে দিলেন? কিন্তু কি ভাবে কি করব? প্রতিদিনই তো বিকেলের পার হয়েই আমার কাজ শেষ হয়, তার আগে তো শেষ করতে পারিনা। আর কালকে উনি বলে গেলেন মহাভারত এর দ্রোণ পর্বের কাজ। অতবড়  পর্ব বাধাই আর আমি তো কিছুই জানিনা শুধু গুরুদ্রোণ এর নাম  ছাড়া। আর বিষয়বস্তু না জেনে বাধাই তো করি না আমি। শুধু যদি সাদা মলাট আটকে দেই তাহলে হয়ত আমার কাজ বেঁচে যাবে কিন্তু এই কাজ টার প্রতি সুবিচার হবে না।

সিদ্ধার্থ বাবু গম্ভীর হয়ে বললেন তোকে তো আমি অন্য কিছু করতে বলেছি কি? যেমন কাজ করছিস কর । অন্য কিছু ভাবতে যাসনা। নিজের মতন কর।
বিশু অবাক হয়ে বলল যদি সূর্যাস্ত হবার আগে শেষ না হয় ? সিদ্ধার্থ বাবু একটু উষ্মা প্রকাশ করে বললেন উফফ তোর অত ভবনা কিসের। তুই যে ভাবে কাজ করতিস সেই ভাবেই করবি।

পরের দিন কাজ চলছে । আকাশে দুপুর থেকে প্রচন্ড মেঘএর ঘনঘটা। এক মেঘ মাথায় করে শেষ বিকেলে রণেন বাবু ঢুকলেন দোকানে । এসেই বললেন কিরে বিশু কাজ শেষ করেছিস ? দেখা কতদূর কি করলি।
সিদ্ধার্থ বাবু বিশু কে এগিয়ে যেতে বললেন স্মিত হেসে। বিশু কাচুমাচু করে বই নিয়ে এল রণেন বাবুর কাছে :  এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। পাঁচ মিনিট লাগবে আর মাত্র।

রণেনবাবু অট্টহস্যে ফেটে পড়ল। বই টা হাতে তুলে বলল জানতাম পারবি না, দেখ সন্ধ্যে হয়ে গেছে ।
বিশুর চোখ ফেটে জল এল। ও আজকে দ্রোণ পর্ব সংক্ষেপে পড়েছে ,বাকিটা সিদ্ধার্থ দার থেকে বুঝেছে দ্রোণ পর্বে কি কি হয়েছিল।
কোন ছবিটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে ভেবেভেবে সময় নষ্ট করেছে। প্রথমে ভাবল অভিমুন্য বধ, তারপর ভাবল ঘটোত্কচ বধ এর ছবি দেবে। দ্রোণ পর্বে দ্রোণের ছবি তো সবাই দেয় এই দুটো একটু আলাদা হতে পারে । তারপর মনে হল না। এর থেকেও গূঢ়তর একটি অর্থ আছে দ্রোণ পর্বে। দ্রোণের মৃত্যু তো শুধু একটি তথ্য কিন্তু এক বীর যদি আশ্রিত কে রক্ষা না করতে পারে সেই বীরের সেখানেই মৃত্যু হয়ে যায়। এই ছবিটাই ভেবেচিন্তে  ঠিক করল মলাটে দেবে। সেই বিশেষ ছবির ব্যবস্থা করতে গিয়েই বিপদে পড়ল আজ,যার জন্য কাজ টাই হরালো। মাথা হেট করে দরজার দিকে এগোতে থাকল বিশু।

হঠাৎ সিদ্ধার্থ বাবু ডাক দিল:  দাড়া  বিশু। কোথায় যাচ্ছিস? বিশু মাথা নামিয়ে বলল আমি হেরে গেছি সিদ্ধার্থ দা। সিদ্ধার্থ বাবু বলল ওহ, হারা জেতা তো পরে হবে। আগে তুই তিন কাপ চা নিয়ে আয় দেখি।

রণেন বাবু বিস্মিত হয়ে বলল :  তার মানে? তিন কাপ চা কে খাবে?
সিদ্ধার্থ বাবু বললেন:  কেন কালকের কথা অনুসারে আমরা তিন জন আজ থেকে একসাথে চা খাব।

রণেন বাবু চিত্কার করে উঠলেন: কি বলছেন কি মশাই? ও তো পারেনি কাজ সারতে। ও আজকেই বিদেয় হবে।
সিদ্ধার্থ বাবু হলকা হেসে বললেন : ও জেতার পরেও যদি আপনি ওকে পরিত্যাগ করেন সেটা তো কথার খেলাপ হবে।
"আরে ও জিতল টা কোথায়? কিছুই বুঝতে পারছি না তো।" প্রায় লাফাতে লাফাতে কথা গুলো উগড়ে দিল রণেন চৌধুরী।

বিশু ও অবাক হয়ে গেছে সিদ্ধার্থ দার কথা শুনে। চোখে মুখে জিজ্ঞাস্য!!
সিদ্ধার্থ বাবু দুজনের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে   বললেন আচ্ছা বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছি :
আচ্ছা রণেন বাবু আপনি বলেছিলেন সূর্যাস্ত এর আগে ওক কাজ শেষ করতে হবে । তো সূর্যাস্ত হতে এখনো ঢের দেরী প্রায় ২০ মিনিট।
রণেন বাবু বলে উঠলেন : কি!! ঐ দেখুন আকাশ প্রায় মেঘে অন্ধকার । সন্ধ্যে হয়েই গেছে।
সিদ্ধার্থ বাবু বললেন আচ্ছা রণেন বাবু আজ কত তারিখ?
রণেন বাবু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন কেন ২১ তারিখ। ২১ শে জুন।
সিদ্ধার্থ আবার জিগ্গেস করলেন আপনি এখন কোথায় আছেন?
রণেন বাবু রেগে বললেন এ কি রসিকতা মশাই? আমি কোথায় আছি মানে! আপনাদের সাথে সামনে বসে আছি।
সিদ্ধার্থ বাবু একটু উঠে দাড়িয়ে বললেন ওহ সেটা না কোন শহরে আছেন?
দূর মশাই কোলকাতায় আছি। আপনার কি মাথা পুরো গেছে নাকি সিদ্ধার্থবাবু; চেচিয়ে উঠলেন রণেন চৌধুরী।
সিদ্ধার্থ বাবু এইবার ভরাট গলায় বললেন রসিকতা না আসলে, আজ একুশে জুন কলকাতা মানে উত্তর গোলার্ধে দিন সব থেকে বড় । এই দেখুন মোবাইল এ দেখাচ্ছে সূর্যাস্ত হতে এখনো আরেকটু দেরী। ও আপনি তো আকাশ বাতাস দেখে দিক নির্ণয় করেন ভালো ভাবে পশ্চিমে তাকিয়ে দেখুন মেঘ কেটে যাচ্ছে।
পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়ল দ্রোণ পর্বের বাধাই মলাটে : জয়দ্রথ বধের দৃশ্যে :

মেঘের আড়াল থেকে গ্রহণমুক্ত সূর্য বেরিয়ে আসছে ; অর্জুন গাণ্ডীব থেকে শর নিক্ষেপ করেছে জয়দ্র্থ এর উদ্দেশ্যে। অন্তরালে কৃষ্ণ স্মিত হাসছে আর দুর্যোধন অবাক হয়ে ভাবছে এটাও কি সম্ভব, দ্রোণ আশ্রিত কেও রক্ষা করতে পারলেন না!!

বই এর মলাট থেকে দৃষ্টি তুলে রণেন বাবু বিহ্বল হয়ে বললেন:  বিশু তিনটে চা ই নিয়ে আয়, সাথে আজকে চপ মুড়িও আনবি তিন ঠোঙা, আমার নামে খাতায় লিখে।
বিশু সজল কৃতজ্ঞ চোখে সিদ্ধার্থ দার দিকে চেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল চা আনতে।
বাইরে বেড়িয়ে দেখল সূর্য এখনো পশ্চিমে হাসছে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"