বাহিরে বারি ঝরে। অন্তর শুদ্ধ করে ।।


বাহিরে বারি ঝরে।
অন্তর শুদ্ধ করে ।।

দুপুর থেকেই মেঘের ঘনঘটায় আকাশ মুখ ঢেকেছে। অফিস এর ধুলোমাখা ফাইল এর পেছনে পেল্লাই ইংরেজ আমলের জানালা । এই পুরনো সওদাগরী অফিসে একটা সদ্যস্নাত সবুজ ঝলক এনে দিয়েছে বর্ষার পিঙ্গল মেঘ। চারদিকে সবাই মুঠোফোন গগনে গরজে মেঘ- এর আগমনী বার্তা তুলে সমাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে না , সবাই না। "আষাঢ়ের শুরুতেই মেঘ টা ঢুকল তাহলে"! একটু চিন্তিত ভাবেই মধ্য বয়সের দেবেশ বিড় বিড় করে বলে উঠল। আজকেও কি তাহলে একই ব্যাপার হবে ? অস্থির হয়ে উঠল মন টা!!
দেবেশ এর কাজ আজকের মতো হয়েই এসেছে, ভাবছে বেরিয়ে পড়বে সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরবে। এমনিতেই কালকে অনেক রাত অব্ধি থেকে একটা কাজ করেছে সবাই মিলেমিশে, আজ সকালে খবর এস্ছে সেই পরিশ্রম সাফল্য পেয়েছে। তাই অফিসে সবার আজ বেশ খুশীর মেজাজ ।
হঠাৎ অফিস বন্ধু রাহুল এসে বলল:  চল ভাই আজ একটু বসি দুজনে,  এই সুন্দর দিনে আষাঢ়স্য দ্বিতীয় দিবসে আনন্দ করি মনের হর্ষে । আজ একটু সোমরস না হলে উদযাপন টাই হবে না।
রাহুল কে অবাক করে দেবেশ বলল :  না ভাই আজ যাব না ইচ্ছে নেই।
রাহুল বিস্মিত হয়ে বলল: মানে, তোর আজকে হঠাৎ অরুচি হল কেন রে? কালকেই তো বললি এই ডিল টা হলে আকণ্ঠ পান করে নীলকন্ঠ হয়ে বাড়ি যাবি আজ। তার মধ্যে এত সুন্দর একটা পরিবেশ আজকে, যাবি না কেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকিরে।
দেবেশ বিরক্তি সহকারে  বলল : আরে না, শরীর খারাপ হতে যাবে কেন।
রাহুল বলল: তাহলে?
দেবেশ উদাস ভাবে জানাল: আসলে আষাঢ় এর প্রথম বৃষ্টির দিনে আমি জানি না কি হয় , কিন্তু কিছু করতে ভালো লাগে না আমার । আর ঐ দেখ বৃষ্টি শুরু হল বলে, আমি বাড়ি যাব আজকে এখনই। দত্ত দা কে একটু বলে দিস তুই।
রাহুল কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বিদ্যুৎ গতিতে পিঠব্যাগ টা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল দেবেশ। রাহুল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল : যা  বাবা, এত উড়েই চলে গেল।

রাস্তায় বেরিয়েই সামনে থাকা একটা হলুদ ট্যাক্সি কে ডাকল দেবেশ। ড্রাইভার দরজা খুলতেই ঝাপিয়ে পড়ল পিছনের সিটে ।
ড্রাইভার দাদা বাগুইআটি চলুন, জলদি। ট্যাক্সি যাত্রা শুরু করল। হঠাৎ দেবেশের উপর দিয়ে দূরবৃষ্টির জোলো হাওয়ার ঢেউ বয়ে গেল, ডালহৌসি থেকে কিছুদূর এগোতে না এগোতেই তেড়ে বৃষ্টি শুরু হল। জলের ছিটের থেকে রক্ষা পেতে কাচ টা তুলে দিল।

কিছু সময়েই দেবেশ পূর্বপরিচিত অতভুৎ  অনুভূতি র আভাস পেল। শরীর ভারি হচ্ছে, খুব হাসফাস অস্বস্তিকর অব্স্থায় সে ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু কিচ্ছু করার সামর্থ্য নেই। চোখ দুটো বুজে আসছে। ট্যাক্সির নরম গদিতে শরীর শক্ত হচ্ছে। সেই এক, একদম এক দৃশ্য ভেসে উঠছে তন্দ্রালু দৃষ্টি তে :

ভয়ংকর কামান গুলো থেকে একটাও গোলা বেরচ্ছে না। বেরোবে কি করে বৃষ্টি তে সব গোলা বারুদ গেছে ভিজে। খুব ভূল হয়ে গেছে আজ রতন সিং এর । সা ফ্রে সাহেব বার বার বলেছিলেন : রতন , বৃষ্টির মরশুম বারুদ যেন ঢাকা থাকে। সে যখন আচ্ছাদন আনবে ভাবছিল তখন প্রধান সেনাপতি এসে বলল এত কষ্ট করে আবার আচ্ছাদন নিবি কেন রতন?
বললাম : গোলন্দাজ প্রধান সি ফ্রে সাহেব বলেছেন আচ্ছাদন দিতে।
শুনে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল সেনাপতি : দূর দূর বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। এ বছর আষাঢ় এসে গেছে এক সপ্তাহ হয়ে গেল বৃষ্টি আসেনি। ঐ আচ্ছাদন আর কি কাজে লাগবে!!
বিপক্ষে রেয়েছে তো মাত্র ২০০ গোরা সৈন্য আর ৮০০ দেশী সৈন্য দুটো কামান , দুই প্রহরেই যুদ্ধ মিটে যাবে। প্রধান সেনাপতি বলছে যখন তাহলে ঠিকই আছে। কি দরকার আবার এসবের।
কিন্তু এ কি হয়ে গেল আমাদের ?
যুদ্ধ শুরুও তো আমরা ভালোই করলাম । ওরা আগে থেকেই আমবাগান এর পিছনে প্রাচীর আগলে দাড়িয়েছে। যাই হোক গুড়িয়ে দিচ্ছিলাম সব গোলার ঘায়ে,  কিন্তু একি আমাদের সিংহভাগ সৈন্য যুদ্ধ ই করছিল না তো ! প্রধান সেনাপতি ও নিশ্চুপ , সব পুতুল হয়ে গেছে!!
লড়ছে শুধু গোলন্দাজ আর কিছু সৈন্য।
প্রধান সেনাপতি যুদ্ধ না করুক আমরাই গুড়িয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎই আষাঢ়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল বাংলার আকাশে দুর্যোগ এর বার্তা নিয়ে। অনাসৃষ্টি  বৃষ্টি ভিজিয়ে দিয়ে গেল বাংলার ভাগ্য, ভিজে গেল আমাদের বারুদ গোলা সব । তখন আমাদের বেরোতেই হল আগল খুলে, ভাবলাম আমাদের মতন ওরাও বারুদ ঢাকেনি। এগিয়ে গেলাম আমরা। কিন্তু ভূল, ওরা মাত্র দুটো কামান এনেও ঢেকে রেখেছিল। আমাদের লড়াকু সেনানী এগিয়ে গেলেই ওরা শুরু করল অগ্নিগোলা বর্ষণ। শেষ হল আমাদের যুদ্ধকারী সৈন্যের সব দম। সব হল আমার দোষে। আমার ভুলে।

আমরা বিশ এর বেশী কামান এনেও আচ্ছাদন এর ব্যবস্থা করলাম না  আর ওরা  মাত্র দুই কামানেই বাজিমাত করে দিল!!
সি ফ্রে সাহেব ইন্তেকালের আগে বলে গেল রতন : আজ মির্জাফর দাড়িয়ে থেকে হারায় নি নবাব কে, তোমার বাংলা কে, তুমি হারিয়ে দিলে কর্তব্যে গাফিলতি করে । উফফ কি কষ্ট!
আমার ও শেষ টান উঠেছে, আর পারছি না সইতে  । গোলার যন্ত্রণার থেকেও বিষ যন্ত্রণায় পুড়ছে আমার মন।
আমি শেষ শ্বাস নেবার আগে পলাশীর প্রান্তরে বললাম : ভগবান আমি না জেনেই এই অপরাধ করেছি। জন্ম জন্মান্তরে আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি তে আমি এই পাপ যেন ধুয়ে নিতে পারি, আমি মুক্তি চাই না।

ও দাদা, দাদা।  বাগুইআটি কখন এসে গেছে এইবার কোন দিকে যাব বলুন।
দেবেশ ঘোর এর মধ্যে তাকিয়ে রইল ড্রাইভার এর দিকে।
কি অব্স্থা দেখুন তো, আপনাকে ডেকেই যাচ্ছি দশ পনের মিনিট ধরে আপনি কিছুই বলছেন না । শেষে বিড় বিড় করে বলে গেলেন বৃষ্টি বৃষ্টি আর কিছু বুঝলাম না। আপনার কি শরীর খারাপ করছে। ডাক্তার হসপিটাল কোথাও যাবেন?
দেবেশ বলল : না। আমি নামবো ।
কিন্তু বাইরে তো অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। দাঁড়ান একটা শেড এর কাছে গাড়ি টা নিয়ে যাই।
লাগবে না দাদা, আমি নামবো এবার।
দেবেশ ৫০০ টাকার নোট টা ড্রাইভার এর হাতে দিয়ে দরজা খুলল। বাইরে আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি!!

ড্রাইভার দেখল একটা মানুষ বৃষ্টি তে ভিজতে ভিজতে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে দৃশ্যপট থেকে।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"