চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন । রাজনীতি তে বাজারের ঋণ ।।
আচ্ছা আপনি কি রাজনীতি পছন্দ করেন ? কিন্তু কোন পক্ষ ঠিক বুঝতে পারছি না। পাঁচ দিন ধরে দেখে যাচ্ছি এক এক দিন এক এক দলের পক্ষে মত দিচ্ছেন। প্রথম দিন ভাবলাম লাল, পরের দিন ভাবলাম না এত লাল না গেরুয়া । ওমা পরের দিন দেখি কিসের গেরুয়া ; এত পুরো সবুজ সাথী ;মনে হল চক দে ইন্ডিয়ার শেষ পেনাল্টি হচ্ছে বামেও না ডানেও না একেবারে মাঝে । ও বাবা!!! তার পরেও চেঞ্জ : কালকে দেখি হাত টান মানে হাতের উপর ও টান টা বেশ গভীর। আবার আজকে দেখছি বেশ আমি কারোর না কেউ আমার না নোটার পক্ষে কথা বার্তা বলছেন। বলছি মশাই আপনি কি চান বলুন তো, থুড়ি কাকে চান বলুন তো? একটু উষ্মার সাথে কথা গুলো বলে প্রায় জুড়িয়ে যাওয়া চায়ে এক চুমুক দিলেন অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী সুবলবাবু। "ইসশশ চা টা একদম ঠান্ডা হয়ে গেছেরে, হরি আরেকবার রিপিট কর তো, কি কমল বাবু অসুবিধা নেই তো। ততক্ষণে আপনার এই মাল্টিপার্টি প্রীতির কারণ টাও একটু বুঝিয়ে দিন।
হরি অর্ডার শুনেই এক গাল হেসে বলল : হ্যা হ্যা দিচ্ছি ৬ কাপ চা তো, আপনেরা গল্প করেন । হরি জানে এই দলটা বিকেল থেকে সন্ধ্যে অব্ধি বেঞ্চে বসে অনেক আলোচনা করে । সবাই অব্সৃত চাকুরিজীবী এনারা। প্রতিদিন সান্ধ্য এই চায়ের আড্ডাতেই মেতে ওঠে সব। ইদানিং ঐ নতুন ভদ্রলোক কমলবাবু এসে জুড়েছেন দলে,মাস খানেক হবে। খুব সুন্দর কথা বলেন; ঐ মাঠপাড়ের দিকেই নতুন ফ্ল্যাট এ থাকেন।
হরির মুখে চা আসছে শুনে চায়ের দোকানের ছয় প্রবীণ বেশ জমিয়ে বসল। সবার দৃষ্টি কমলবাবু র প্রতি, উনি কি বলেন তা শোনার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষমান তাদের মন। কমল বাবু একটু থেমে মুখে স্মিত হাসির আবেশ নিয়ে বললেন : আরে না না মশাই ব্যাপার টা সেরকম না । আচ্ছা আপনারা প্রথমে বলুন তো রাজনীতি ব্যাপার টা নিয়ে কি ভাবেন?
কেউ কিছু বলার আগেই পক্ককেশ অভিজ্ঞ নির্মল বাবু বলে উঠলেন : আর কি ভাবব মশাই ! রাজনীতি মানে ভোটের নীতি। ঐ তো এক পাঁক। যতই ঘাটবেন ততই পরিবেশ দূষণ হবে। কে কত খারাপ , এই নিয়েই দলাদলি।
তার মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নিয়ে এগোনো। ভোট আসলে একটু মাতামাতি ব্যস, এটাই তো রাজনীতি। বাকি চার জন সম্মতিসূচক মস্তিষ্ক প্রক্ষলন করল।
কমল বাবু মুখের স্মিত হাসি ধরে রেখেই বললেন : আচ্ছা আপনারা বাজারে যান তো? তাহলে ধরে নিন রাজনীতি হচ্ছে একটি বাজার । প্রত্যেক দল হচ্ছে দোকানি আর আমি আপনি আমরা হলাম তাদের নীতি নির্ধারক ক্রেতা।
নির্মলবাবু মাঝ থেকে চোখ বড় বড় করে বলল: বলেন কি মশাই !!! বাজার আর রাজনীতি এক!!!! এ কি অতভূৎ কথা , পিতৃপুরুষের কালেও শুনিনি। বাকিরাও তালেতাল মেলাল : হ্যা কিছুই তো বুঝলাম না।
সুবল বাবু সবার উদ্দেশ্যে গলা খাকরি দিয়ে বললেন, আরে ওনাকে বোঝাতে তো দিন, আমিও বুঝিনি কিন্তু কমল বাবু; একটু খোলসা করে বলুন।
কমলবাবু ধীর লয়ে বলে উঠলেন :
আচ্ছা আপনারা কে কখন বাজারে যান ভাবুন দেখি? কেউ ভোর সকালে তো কেউ একটু পরে আয়েশ করে হেলে দুলে, আবার কেউ বেশ বেলা করে হন্তদন্ত হয়ে একদম বাজার ওঠার সময়ে।
সুবল বাবু বললেন : তাতে কি হল?
কমলবাবু উত্তর দিলেন তাতেই তো সব হয়ে গেল দাদা। একবার ভেবে দেখুন আপনি শেষ বেলায় বাজারে গেছেন , সব দোকানেই মালপত্র বাড়ন্ত , ঝড়তি পড়তি জিনিষে ভর্তি। আপনি হাজার চাইলেও খ্যাপা র মতন খুজেও ওদের কারোর থেকে ভালো জিনিষ কি পাবেন? সব দোকানি তখন নিজের পচা ধচা জিনিষ গছাতে চাইবে, এ বলবে ওর দোকানে সব পচা , সব পচা । আমার টা ওর থেকে অনেক ভালো। আর আপনি তখন সব খারাপ এর মধ্যে কোন টা কম খারাপ সেইটা বিচার করবেন আর একটু কম খারাপ কে নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই কম খারাপ জিনিষ এ আপনার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি না হলেও পেট গুড় গুড় হবার বেশ সম্ভাবনা থেকেই যাবে। তবুও ভাববেন যাক গে ও দোকানি কি আর এমন পচা জিনিষ দিয়েছে, অন্য দোকানে তো আরো পচা ছিল; খেলে মরেই যেতাম না হলে হসপিটাল যেতে হত।
এইবার দেখুন বাজার যদি রাজনীতি হয় আপনি সেই রাজনীতি নিয়ে যত্র তত্র সর্বত্র সভা গরম করেন যখন তার পঞ্চবার্ষিকী পরীক্ষা আসে ভোটের মাধ্যমে। মানে শিয়রে সমনের কালে। সব দল; বিপরীতে সবার নীতি খারাপ বলেই চেচিয়ে বেড়ায়। বলেই একটু থামলেন কমল বাবু।
সাথে সাথেই সবাই মোটামুটি বলে উঠল ঠিক বলেছেন এই ব্যাপার টা বুঝলাম। কিন্তু এর সাথে আপনি সব দলের হয়ে সুখ্যাত করছিলেন কেন সেটা তো বুঝলাম না?
কমল বাবু স্থিতধ্বী মানুষ। আবার মুখের সেই শান্ত হাসি টা ফিরিয়ে এনে বললেন দেখুন :
বাজার শুরুর সময় সব দোকানি কিছু না কিছু সেরা টাটকা জিনিষ নিয়েই দিন শুরু করে । সেরকম সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই কিছু কিছু ভালো ভবনা নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে পূর্ববর্তী ভোটের পরে ;
কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে সব দোকানিই তখন বলে বেড়ায় ও পচা জিনিষ বেচে আমি ওর থেকে অন্তত ভালো বেচছি , আর আমরাও পাঁচ বছর এর শেষ লগ্নে ঝাপিয়ে পড়ছি সেই শেষ বাজারে। কার কি খারাপ সেইটাই তখন ঘুরে বেড়ায়। তাই বলছি
প্রথম থেকে দেখুন , প্রথম থেকে বুঝুন প্রথম থেকে মনে রাখুন । রাজনীতি কে দুরে সরিয়ে রাখলে আপনি নিজের হাতে নিজের নিয়ন্ত্রণ দুরে সরিয়ে দিচ্ছেন। শুধু ভোট মানেই রাজনীতি না , রাজনীতি র পরীক্ষা হল ভোট।
রাজনীতি নিয়ে প্রথম থেকেই ভাবুন, কে কি ভালো করছে কে কি ভূল করছে নজরবন্দী করুন। সব দলের মধ্যেই কিছু ভালো বিষয় ও থাকে। সেই বিষয় গুলো নিয়ে যদি তুলনা করেন তখন তুলনা হবে কে একটু বেশী ভালো। তাতে রাজনীতির মান , আপনার জীবন যাপনের মান উন্নত থেকে উন্নততর হবে।
লড়াই টা মন্দ- অল্পমন্দ থেকে পরিবর্তিত হয়ে এসে দাড়াবে ভালো-বেশভালো-খুবভালো র মধ্যে। তাই সমালোচনা র সাথে ভালো বিষয় গুলোর প্রতি একটু নজর দিন। আপনি চাইলে দোকানি আপনার চাহিদা মতন পণ্য যোগাড় করেই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামবে। লড়াই টা ভালোর মধ্যে ফিরিয়ে আনুন । কমলবাবু চুপ হলেন। সাথে সবাই নিশ্চুপ । ছয় কাপ চা হাতে হরি ও চুপচাপ দণ্ডায়মান।
রাস্তায় সন্ধ্যের বাতি গুলো ধীরে ধীরে জেগে উঠল দিবানিদ্রা থেকে, অন্ধকারে আলো ছড়াতে শুরু করল ।।
©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন