১২ ই জুন : অবাক পৃথিবী অবাক করলে তুমি!

না না জন্মের থেকে আমি বিক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি সেভাবে দেখিনি, কিন্তু গ্লানির্ভবতি ভারত এর রূপ দেখেছি।

কি ভাবছেন নিশ্চয়ই নেহেরু-নেতাজী , দেশ ভাগ, বিভিন্ন সময়ের কিম্ভূত রাজনীতি, বেকারত্ব, আর্থিক প্রতারণা এই গুলোই গ্লানির বিষয় হিসেবে পুনরায় বকবক করে যাব।
না, আমি ঠিক এই গুলো নিয়ে বিশেষ বলব না আজকে। অন্য আরেকটা বিষয় নিয়ে একটু বলি? যদি অভয় দেন বলেই ফেলি।

সোমবার উফফ দিনটা কেন আসে? আরামের ঘুম টা ভেঙ্গে প্রথম এই কথা টাই মাথায় এল সমীরের। সমীর একটি বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে । এখনই শুরু হবে পাইপাই করে টানা দৌড় আর চলবে সেই শুক্রবার রাত অব্ধি। যাই হোক সকালের কাজকর্ম সেরে একটু লাফালাফি করে কফি নিয়ে খবরের কাগজের পাতায় চোখ বোলাতে না বোলাতেই  হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল টিং টং । রিমা ; সমীরের স্ত্রী বলল : মনে হয় কাজের দিদি এল, একটু দরজাটা খুলে দাওতো।  আমি সব্জি কাটছি আর মা রান্না বসিয়েছে। অগত্যা বেজার মুখে পেপার তুলে রেখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সমীর উন্মুক্ত দ্বার নীতি নিল।
দিদি হাসিহাসি মুখে ঢুকল। সাথে লাল টুকটুকে ফ্রক পরা একটা পুচকে মেয়ে এসেছে । সমীর জিজ্ঞেস করল : দিদি ও কে? তোমার মেয়ে নাকি?
দিদি হেসে বলল হ্যা গো দাদাবাবু। আজ  নিয়ে এলাম আমার সাথে ।
সমীর বলল:  নিয়ে এসেছ ভালো। আয় আয়, কি নাম তোর ?
ছোট্ট মেয়ে টা মাথার দুই ঝুটি নেড়ে লাজুক মিষ্টি হেসে নাম বলল সোনা।
সমীর অফিসের জন্য রেডি হবে, তাই একটু তাড়ায় আছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল বা খুব সুন্দর নাম তো তোর , তা  কোন  ক্লাসে পড়িশ?
সোনা সেই প্রশ্ন টা শুনে মুখটা নীচু করে ফেলল,কিন্তু সমীর উপরতলায় চলে যাওয়ায় সেটা আর চোখে পড়ল না। যাই হোক সোনা আর ওর মা  উপরে উঠেও বাড়ির বাকি দের সাথে কথা বলছে।

একটুপরে অফিসের জন্য রেডি হয়ে টেবিলে প্রাতরাশ করতে বসেছে সমীর । রিমা ছেলে কে ঘুম থেকে তুলে রেডি করছে স্কুলের জন্য । মা ঘরের বাকি কাজ সারছে। খেতে খেতে সমীর দেখল দিদি ঘর ঝাড় দিচ্ছে। তার হঠাৎ মনে হল: আরে ছাদের কলে বাসন পরিষ্কারের শব্দ শুনলাম কিন্তু দিদি তো এখানে, তাহলে উপরে বাসন ধুচ্ছে কে !!
চেচিয়ে জিজ্ঞাসা করল:  দিদি উপরে ছাদের কলে বাসন কে পরিষ্কার করছে ?  তুমি তো এখানে।
দিদি হেসে বলল : সোনা আছে তো উপরে, ওই  বাসন মাজছে ।
সমীর বিস্মিত হয়ে বলল:  মানে! তুমি ওকে দিয়ে কাজ করাচ্ছ দিদি। ও তো বাচ্চা মানুষ, আমি ভেবেছি ওকে ঘুরতে নিয়ে এসেছ । কি করছ এইটা। এক্ষুনি এটা বন্ধ করো দিদি।
দিদি কাচুমাচু হয়ে বলল দাদাবাবু উপায় নেই। এতদিন তো এই সব ভাবতেই হয়নি গো, এই ২ বছর আগেও তো স্কুল এ যেত। ঐ রাক্ষুসে করোনা এল সব পাল্টে গেল। আগে আমি আর ওর বাবা কাজে বেরোলে ,ও ওর দিদি, দাদা সব এক সাথে থাকত। এক সাথে স্কুল যেত।  সারাদিন নিশ্চিন্ত থাকতাম এই ভেবে যে তিনটে তে মিলে এক সাথে আছে, অসুবিধা হবে না ওদের।
সমীর ভুরুকুঁচকে জিগ্গেস করল : তা এখন তারা মানে ওর দাদা দিদি কোথায়? আর আগে স্কুলে যেত মানে , এখন কি আর যায় না?
শুনে দিদি বলল : না গো দাদাবাবু ওর স্কুল থেকে নাম কাটিয়ে দিয়েছি। ওর দিদি র বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। আর ছেলে এখন কাজে যায়। এই দু বছর স্কুল তো ছিল না সাথে আমাদের কাজও তেমন কিছু ছিলনা। তাই তখন থেকেই এদিক ওদিক করে চেষ্টা করে কাজ কর্ম করেছি, ছেলে মেয়ে গুলোও জুড়ে গেছে আমাদের সাথে, বাড়তি কিছু পয়সাও এনেছে ঘরে । এখন থেকে সবাই এক সাথেই খাটব । সোনা কেও আমি আমার সাথে নিয়ে কাজ শেখাব । একা বাচ্চা কে কোথায় রেখেই বা আসি, তর থেকে কাজও শিখবে পয়সাও আসবে কিছু। তাই আজ থেকে নিয়ে এলাম সাথে করে ।
সব শুনে সমীর বলল :  দিদি এটা কি ঠিক করছ? ওরা যদি পড়াশুনা জানত তাহলে তো আরো অনেক কিছু জানতে পারত। ওদের তো ভবিষ্যৎ ভালো হতে পারত। তুমি তোমার ছেলে মেয়ে দুজনকেই আবার স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে যাও দিদি। পড়াশুনা ছাড়া গতি নেই, কোনোদিন হয়ত দেখবে ওরা এত ভাল কাজ করছে তোমার আর এই পরিশ্রম এর কাজ করতে হবে না। না হলে তুমি তোমার জীবনে যা যা কষ্ট করেছ এক ই ব্যাপার ওদের মধ্যেও চলতে থাকবে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

দিদি শুনে বলল দাদাবাবু তুমি সব কথাই ঠিক বলেছ। কিন্তু এরা ছোট হলেও পয়সার স্বাদ পেয়ে গেছে। এরা নিজেরাই আর ফিরতে চায় না। আর  সংসার টাও তো এখন ভালোই চলছে।

সমীর বুঝল এই নরম বোঝান তে কাজ হবে না, একটু গম্ভীর হয়ে বলল কিন্তু এটা জানতো এদের এখন কাজের বয়স হয়নি।
দিদি একটু হেসে জবাব দিল : আরে দাদাবাবু এ তোমাদের ঘরের বাচ্চা না, আমাদের ঘরের বাচ্চারা অনেক কাজ করতে পারে। আমরাও তো ছোট বেলায় কাজে ঢুকেছি। আমাদের অসুবিধা নেই।

সমীর রাগত স্বরে বলল : দিদি তুমি যা বলেছ তার পেছনে যুক্তি থাকলেও একটা বিষয় তোমার মাথায় ঢোকেনি। আজ যদি তোমার ছেলে মেয়ে রা কাজ করে বেড়ায়, পড়াশুনা না করে তাহলে শুধু তুমি ডুববে না , আমরাও ডুবব। সারা দেশ ডুববে, ভবিষ্যৎ ডুবে যাবে দেশের। তুমি আজ দেশের সাথে অন্যায় করছ দিদি, এটা তো আমি মানব না। আইন এ বলাই আছে শিশুশ্রম দন্ডনীয় অপরাধ। আর যে যে সেই অপরাধ এর সাথে যুক্ত তাদের সবার শাস্তি হবে। এবার ভেবে দেখ তুমি তোমার ছোট্ট মেয়ে কে দিয়ে, ছেলে কে দিয়ে কাজ করিয়েছ সেটা আমি পুলিশ এ জানাব নাকি ওদের আবার স্কুলে ফেরত পাঠাবে?

এরকম রাগত ভঙ্গী ও পুলিশ এর কথা শুনে দিদি ভয় পেয়ে গেছে। একটু ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলছে দাদাবাবু পুলিশ এ বোলোনা। আমি দেখছি কি করা যায়। হাঁক পাড়লো:
এইইই সোনা এদিকে আয়, বাড়ি যাব । ছোট্ট মেয়ে টা দৌড়ে দৌড়ে এল মা র সাথে বেরিয়ে গেল মার হাত ধরে।  সমীর এর মা আর স্ত্রী দুজনে তো অগ্নিগর্ভ হয়ে দাড়িয়ে আছে। রিমা চেচিয়ে বলল :  কাল থেকে আর আসবে না এরা নিশ্চিত। এইবার আবার নতুন লোক খুজ্তে হবে। সব কিছু তে এই লোকটার বাড়াবাড়ি।
সমীর শান্ত হয়ে বলল: হয়ত আসবে বা হয়ত আসবে না কিন্তু এই বোঝান বা ভয়ে ওরা যদি ওদের ছেলে মেয়ে দের আবার স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাদের ভবিষ্যৎ ভালো আসবে। সেই কথা টা মনে আছে তো বোকা বন্ধু র থেকে চালাক শত্রু অনেক ভালো।
আজ এদের সন্তান রা যদি স্কুল না যায় এদের কোনো ভিত্তি তৈরী হবে না, এদের যে যেমন খুশী সাজোর মতন সাজাবে, যেমন খুশী নাচোর মতন নাচাবে। সুতরাং সাধু সাবধান।

তিন দিন পর সকালে রিমা ঘর মুছ্ছে। সমীর ছেলে কে স্কুলের জন্য তৈরী করছে নিজে তৈরী হয়ে। মা রান্না ঘর সামলাচ্ছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল টিং টং। রিমা  সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে বাড়ির দরজা খুলল । দেখে কাজের দিদি দাড়িয়ে আছে চুপটি করে ।
রিমা অবাক হয়ে বলল: দিদি তুমি?
দিদি উত্তর দিল : হ্যা গো বৌদি, দুদিন আসতে পারিনি। সেদিন দাদা বাবু র সাথে কথা বলে খুউব রাগ হল। ভাবলাম কোনোমতেই আর তোমাদের কাজ করব না। কিন্তু রাস্তায় যেতে যেতে সোনা আমাকে বলল ঐ লোকটা ভালো মা, আমাদের স্কুল এই পাঠিয়ে দাও। স্কুলে আমরা ভালো ছিলাম। দাদা কি সুন্দর কবিতা পড়ত ঘরে, আমি দিদি কত গল্প পড়তাম কত নতুন জিনিষ জানতাম । আর এখনতো আমরা নতুন কিচ্ছুটি জানতে পারছিনা মা। কবিতা বলা দাদা এখন লুকিয়ে লুকিয়ে বাজে নেশা শুরু করছে, আমি সেদিন ওকেও বলতে শুনেছি যেখানে কাজ করে অনেকেই কাজ শেষে নেশা করতে যায়,ওরও ভালো লাগছে না।
ঐ লোকটা ঠিক বলেছে মা । আমরা না পড়লে খারাপ হয়ে যাব মা। আমাদের স্কুল এ ফিরিয়ে দাও মা।
সোনার মুখে এই শুনে আমি ওক জড়িয়ে ধরলাম ।   কাদতে কাদতে বললাম হ্যা রে মা আমি ভূল করছিলাম, তোকে আবার স্কুলে ফেরত পাঠাবই । তুই যা বললি আমি তো তোর থেকে এত বড় হয়েও এতদিন কেন বুঝিনি রে। না পড়লে সত্যি তোরাও আমাদের মতই থেকে যাবি।
কাল থেকেই ওরা দুই ভাই বোন স্কুলে গেছে।
বৌদি, দাদাবাবু আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।
রিমা সজল চোখে হেসে বলল : দুটো ঘর আমার মোছা হয়ে গেছে, বাসন টা তুমিই মেজে দাও যাও।
কাজের দিদি লাফিয়ে বলল আগে দাদাবাবু কে বলে আসি দাড়াও বৌদি।
সমীর সিঁড়ির বাঁক থেকে বলল আমি সব শুনেছি দিদি, বলেই এক গাল হেসে দিল।

১২ ই জুন বিশ্ব শিশুশ্রম বিরোধী দিবস ।  শিশুদের আজকে শেখার জানার পড়ার সুযোগ করে দিন , কাল ওরা বিশ্বের ভালো থাকার কারণ হবে। ❤🤝🙏🏼🧒👦👧🧑📚📖🪔

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"