প্রাণ ভরিয়ে ভলিনী ছিটিয়ে !

আজকে পিতৃ দিবস। মানে বিশুদ্ধ মার্কিন মতে আজ বাবাদের দিন। হ্যা,বছরে এক দিন এর জন্য বাবা কে উপলক্ষ করে আনন্দ উৎসব।  বাবারাও মনেমনে বেশ খুশী আজকে,  চারিদিকে তারা  বাবা, শ্বশুর রূপে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন বৈদ্যুতিন সমাজ মাধ্যমে। কি সুন্দর ওয়াহ ওয়াহ লাগছে চারদিকে: ছুটির দিনে সদ্য চাকরি পাওয়া সুনীলও ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতে ভাবল আমিও বাবা বন্দনা করি তাহলে , কিন্তু কিভাবে করব?
আচ্ছা একটা কাজ করি। ছোট বেলা থেকে বাবার শেখানো কিছু নীতি জ্ঞান প্রকাশ করি বরং। ওদিকে কালকে রাতে যা ঘটে গেছে তার রেশ টাও যে কাটছে না এখনো!!

সুনীল লিখতে বসল :
না বাবা , প্রথমেই এতসব বলছি না যে তুমি ছিলে তাই আজ আমি এইখানে পৌছেছি, মানে এটা তো ধ্রুব সত্যই যে ভূগোলকে আমি এলাম তার কারণ তুমিই;
আবার বড় হয়ে উঠলাম সেটাও তোমার ছায়াতেই, মানে এটা তো সত্যি তাই বলে আর শব্দ বর্ধন করি কেন? এসব বলছি না ।
বলছি দুটো বিশেষ বিষয় এর ব্যপারে । অন্য অনেক বিষয় এর মতন এই দুটো বিষয়ও আমি আর আমার ভাই অনিল, আমার বাবার থেকে শিখেছি বা বলা ভালো শেখার প্রচেষ্টা করেছি; কিন্তু ব্যবহারিক প্রয়োগ হয়েছে ভিন্ন থেকে ভিন্নতর । সেই বিষয় দুটোই একটু আধটু আলোচনা করা যাক কালকে রাতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনার নিরিখে।

কাল গভীর রাত। আমি তিনতলায় শুয়ে আছি। নীচে দোতলায় আমার বাকি পরিবার থাকে। পরিবার মানে বাবা সুনির্মল রায় : রিটায়ার্ড ব্যাঙ্ক আধিকারিক, গৃহকর্ত্রী মা; আর  ইঞ্জিনিয়ারিং এর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আমার ভাই অনিল। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে আমি উপরে উঠে এসেছি। বাবা,মা কে শুভরাত্রি বলে এসেছি , মোবাইল টা খুট খুট করতে করতে কখন যেন  চোখ লেগে গেছে টেরই পাইনি আমি।
হঠাৎ নীচতলা থেকে মায়ের তীব্র চিত্কারে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আশঙ্কিত হয়ে পড়েছি! এই রাতে কি হল আবার? আমি ত্রিতল থেকে ধরাধামে অবতীর্ণ হতে হতে মায়ের সেই চিত্কার শুনতে পাচ্ছি আরো  সুস্পষ্ট! তবে চিত্কার এর থেকেও সেটা প্রবল গর্জন আর হুঙ্কার এ পরিণত হচ্ছে যত এক এক করে সিঁড়ি ভাঙ্গা অঙ্ক কষে দ্বিতলে ল্যান্ড করছি।

ওমা এ কিসের গন্ধ? এ তো খুব চেনা গন্ধ, কিন্তু তীব্রতা নাক ঝাঝিয়ে দিচ্ছে। ঘুম চোখে উঠে হঠাৎ দৌড় এর ফলে মাথাও কাজ করছে না নাকি? চেনা চেনা গন্ধের সারি তবু কেন চেনা নয়? হঠাৎ অনুধাবন করলাম এতো ভলিনী র ঝাঝালো গন্ধ, কিন্তু এই গন্ধ কেন? মা প্রচন্ড চেচাচ্ছে, ওদিক থেকে ভলিনীর তীব্র গন্ধ পাচ্ছি। তাহলে হয়েছে টা কি?
মা বাবা কেউ কি পড়ে গেছে নাকি? ভাই কি করছে?
দারুণ উদ্বেগ আশ্ঙ্কায় বেগ বাড়িয়ে দিলাম। মা র ঘরে উল্কার মতন আছড়ে পড়লাম ! কিন্তু এ কি? কি দেখছি? বাবা চেয়ার এ বসে নির্বিকার চিত্তে পেপার পড়ছে। ভাই গল্পের বই দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে, আর মা নৃত্যকালী র মতন এদিক ওদিক ছুটছে?
আমি সবিস্ময়ে জিগ্গেস করলাম : কি হয়েছে মা ? এই ভাবে রাতবিরেতে চিত্কার করছ কেন? ভলিনী র গন্ধ কেন চারদিকে? পড়ে গেছ না চোট লেগেছে? কি হয়েছে বলো ?
এক নিশ্বাস এ কথা গুলো শেষ করবার আগেই মা ঘর কাপিয়ে উত্তর দিল "তুই দেখ সে কি করেছে? আমি পাগল হয়ে যাব এইবার। "
জিগ্গেস করলাম কে কি করেছে?
মা উত্তর দিল:  সারাদিন খেটে খুটে একটু গা এলিয়েছি , হঠাৎ ঘরের মধ্যে একটা ভ্যাপসা মতন গন্ধ আসছিল। তোর বাবা কে বললাম ঐ খানে দরজার কোণে  ল্যাভেণ্ডর এর রুমফ্রেশনর আছে একটু স্প্রে করে  দাও তো, এই ভ্যাপসা গ্ন্ধতে গা গোলাচ্ছে।
কি অত্ভুৎ লোক রে বাবা!!! পেটে পেটে এমন বুদ্ধি, উফফ সে কি করল জানিস?
আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম কি করল?
সারা ঘরে ফুস ফুস করে প্রাণ ভরে ভলিনী স্প্রে করে দিল, আর সেই ঝাঝে আমার তন্দ্রা গেল ছুটে, ঘুমটা গেল চটকে।
এখন দেখ নির্বিকার চিত্তে খবর এর কাগজ পড়ছে যেন কিছুই হয়নি  !! "
আমি বিহ্বল হয়ে বাবা কে জিগ্গেস করলাম বাবা ল্যাভেণ্ডর এর যায়গায় হঠাৎ ভলিনী স্প্রে করলে কেন?
বাবা গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল: তোর মা প্রথমত আমাকে ল্যাভেন্ডর স্প্রে করতে বলেনি বলেছিল বেগুনী স্প্রে টা করতে, আর দ্বিতীয়ত ঘরের কোণে বেগুনী স্প্রে এটাই পড়েছিল। আমি ভাবলাম এটাই করতে বলেছে, তাই করেছি ।
তোর মা কে জিগ্গেস কর সে আমাকে ল্যাভেণ্ডর স্প্রে করতে বলেছে কি নাকি বেগুনী স্প্রে করতে বলেছে?
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মা কে বললাম তুমি কি বেগুনীই স্প্রে করতে বলেছিলে বাবা কে?
মা আমতা আমতা করে বলল: কি করে বুঝব বল যে বেগুনী মানে ভলিনী স্প্রে করবে!!  এত বড় অফিসার ছিল সে এইটা বুঝবে না আমি কি ভাবছি, কি ভেবে বলেছি?

বাবা জলদ গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল :  তোদের ছোট বেলা থেকে বলেছিলাম না যা বলবি স্পেসিফিক বলবি, অর্ধেক বলবি না। আমি ব্যঙ্কিং ফাইনান্স এর লোক, তাই আমি স্টেটমেন্ট অনুসারে কাজ করি। ভাবের ঘোরে কথা বললে এরকমই হবে, মনে ভাবছি নীল  লোক কে টাকা দেব ক্যাশিয়ার কে বলছি বেগুনী লোক কে টাকা দিয়ে দিন তো !!
আমি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এইবার ভুরুকুঁচকে ভাই অনিল এর দিকে তাকিয়ে বললাম তুই কি করছিলিস? এ সব হচ্ছে দেখেও বন্ধ করলি না কেন।

ভাই হাসতে হাসতে উত্তর দিল বাবা আরেকটা জিনিষ শিখিয়েছে ভুলে গেলি দাদা ?
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি বলতো ভাই ?
অনিল বলল :  পৃথিবী আনন্দময় , যে যেই ভাবে আনন্দ নিতে চায় তাকে সেই ভাবে নিতে দেওয়া উচিৎ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম:  কার আনন্দ?
ভাই বলল : এত সুন্দর একটা ঘটনা ঘটছে, আমেরিকা রাশিয়া মিসাইল ছুড়ছে আর আমি সেখানে সঙ্গে কুমন হয়ে আনন্দ নেব না ভাবলি কি ভাবে?
বলেই হো হো করে হাসতে লাগল, আমিও হেসে দিলাম।

©️অভ্রজ্যোতি ঘোষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পাঠ প্রতিক্রিয়া

"চল, হয়ে যাবে !"

"এন্ড তাক সব কুছ ঠিক হো যাতা হ্যায়।"